মানুষ মাত্রই সত্য মিথ্যার মিশেল। সত্য সুন্দর কিন্তু মিথ্যে? মিথ্যে হলো সকল অপরাধের সূতিকাগার। ইদানীং আমাদের সমাজে মিথ্যোর চর্চা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যা দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। আমরা বিশ্বাস করি, মানুষ যদি শুধু সত্য কথা বলার চর্চা করতো, তাহলে যাবতীয় অপরাধ, বিশৃঙ্খলা, অসততা অর্ধেকের বেশি কমে যেতো। সত্যবাদিতা কেবল একটি ব্যক্তিগত গুণ নয়, এটি একটি উন্নত সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি। সত্য কথা বলার চর্চা বাড়লে অপরাধ এবং বিশৃঙ্খলা সত্যিই অভাবনীয় হারে কমে যেত। এই বিশ্বাসের সাথে সকলের সহমত হওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণগুলো আজ আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
অধিকাংশ অপরাধ সংঘটিত হয় সত্য গোপন করা বা মিথ্যা অজুহাত দেওয়ার সুযোগ থাকে বলে। মানুষ যদি জানত যে তাকে সবসময় সত্য বলতে হবে, তবে অপরাধ করার আগে সে দশবার ভাবত। কারণ সত্য বললে তার অপরাধ প্রকাশ পেয়ে যাবে, আর মিথ্যা বলার পথ বন্ধ। এজন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জবাবদিহিতা থাকলে আমাদের সমাজ থেকে দুর্নীতি ও অসততা রোধ করা অনেকটা সহজ হতো। আর্থিক জালিয়াতি, ঘুষ বা দাপ্তরিক দুর্নীতির মূলে থাকে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া। হিসাবের স্বচ্ছতা এবং তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত থাকলে দুর্নীতির সুযোগ অর্ধেকের বেশি কমে যেত। আবার বিচারের স্বচ্ছতা থাকলে আদালতে বা সামাজিক বিচারে যখন কোনো পক্ষ মিথ্যা তথ্য দেয়, তখনই প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি পায়। সবাই সত্য বললে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সহজ হতো এবং সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।
এছাড়া সমাজে বিশৃঙ্খলার একটি বড় কারণ হলো একে অপরের প্রতি আস্থার অভাব। গুজব বা মিথ্যার মাধ্যমে প্রায়ই সামপ্রদায়িক বা সামাজিক দাঙ্গা বাধানো হয়। সত্যের চর্চা থাকলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও স্থিতিশীলতা থাকলে এই ভুল বোঝাবুঝি বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকত না। সুতরাং সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য আমাদের এখনই শক্ত হাতে হাল ধরা উচিত। তবে বাঙালির সমাজব্যবস্থায় বা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কেবল নৈতিক উপদেশ দিয়ে সবসময় কাজ হয় না। আমার মনে হয়, সত্য বলার ক্ষেত্রে একধরনের আইনের প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবং এই আইন থাকতে হবে বড়দের জন্য। কারণ যখন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মিথ্যা বলে বা দুর্নীতি করে পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ সততার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যখন সমাজ দেখবে যে ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়’ এবং মিথ্যা বলে পার পাওয়া অসম্ভব, তখন সাধারণ মানুষ স্বক্রিয়ভাবে সত্যের চর্চা শুরু করবে। আবার অনেক সময় আইন মেনে চলতে চলতে সেটা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়। যেমন বিদেশে বাঙালিরা ঠিকই ট্রাফিক আইন মানে বা লাইনে দাঁড়ায় কারণ সেখানে আইনের প্রয়োগ কঠোর। অর্থাৎ কঠোর আইন প্রয়োগ মানুষের দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভ্যাস বদলে দিতে বাধ্য করে।
আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলে থাকি, পারিবারিক শিক্ষা শিশুদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিবার সন্তানকে সততা শেখালেও সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি মিথ্যার জয়জয়কার থাকে, তবে সেই সন্তান দ্বিধায় পড়ে যায়। তাই পারিবারিক শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখতে এবং সেটির ফলাফল পেতে হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর আইনের সুরক্ষা এবং প্রয়োগ অপরিহার্য বলে আমার মনে হয়। তবে একটি সুন্দর সমাজ পেতে হলে আমাদের অবশ্যই উচিত গোড়ায় জল ঢালা। অর্থাৎ শিশুদের দিকে নজর দেয়া। তাই পরিবারের বড়রা যদি সত্যের চর্চা করে, তবে শিশুরা তাই–ই শিখবে। শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় আইন হলো বড়দের আচরণ। আপনি যদি ছোটখাটো বিষয়েও শিশুর সামনে সত্য বলেন, তবে সে প্রাকৃতিকভাবেই তা শিখবে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘ভালো ছাত্র‘ তৈরির পাশাপাশি ‘ভালো মানুষ’ তৈরির কারখানায় রূপান্তর করতে হবে এবং এটি এখন সময়ের দাবি। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা জিপিএ বা ভালো ফলের পেছনে যতটা ছুটছি, নৈতিকতা বা চরিত্র গঠনের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। শিশুদের মধ্যে সততার বীজ বপন করতে শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আসা খুবই প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। যেমন–
১.মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা– বর্তমানে শুধু পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়াকে সফলতার মাপকাঠি ধরা হয়। এর বদলে যদি শিক্ষার্থীর সততা, সহমর্মিতা এবং আচরণের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকত, তবে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই নৈতিক হওয়ার তাগিদ অনুভব করত।
২.গল্প ও রোল মডেলের অভাব–শিশুদের কল্পনাশক্তি বেশি, তাই তারা আদর্শ চরিত্রগুলোকে অনুকরণ করতে পছন্দ করে। এজন্য পাঠ্যবইয়ে শুধু তাত্ত্বিক বিষয় না রেখে বাস্তব জীবনের এমন সব মানুষের গল্প থাকা উচিত যারা চরম বিপদেও সত্য বলে জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ শিশুদের সামনে একজন আইডল থাকা উচিত বলে মনে করি।
৩.ব্যবহারিক ও নৈতিক শিক্ষা– কেবল বই পড়ে সততা শেখা কঠিন। শ্রেণিকক্ষে এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত যেখানে ভুল স্বীকার করলে শিক্ষক তাকে বকা না দিয়ে বরং সত্য বলার জন্য পুরস্কৃত করবেন। এতে শিশুর মন থেকে মিথ্যার ভয় দূর হবে।
৪.শিক্ষক ও অভিভাবকের ভূমিকা– শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা দ্রুত শেখে। যদি সিলেবাসে সততার কথা লেখা থাকে কিন্তু বাস্তবে তারা শিক্ষক বা অভিভাবককে মিথ্যা বলতে দেখে, তবে সেই শিক্ষার কোনো মূল্য থাকে না। তাই বড়দের আচরণে পরিবর্তন আনাও এই শিক্ষা ব্যবস্থারই অংশ হওয়া উচিত।
৫.প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন সহযোগী হয়ে ওঠা–আমাদের দেশের সিস্টেম শিশুদেরকে একে অপরের সহযোগী না করে প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে দেয়, যার ফলে অনেকে টিকে থাকার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়। এর বদলে দলগত কাজ এবং একে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করলে অসততার প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে বলে আমার ধারণা। এখন বলবো সত্য কথা বলা বা নৈতিক শিক্ষার জন্য দেশে আইনের প্রয়োগও জরুরি। কারণ আমরা উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখি যে, মানুষ সত্য বলে বা নিয়ম মানে দুটি কারণে, প্রথমত তারা এটাকে সঠিক মনে করে, আর দ্বিতীয়ত তারা জানে যে নিয়ম ভাঙলে বড় ধরনের জরিমানা বা শাস্তি নিশ্চিত।
আমাদের দেশে পারিবারিক শিক্ষা অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে বা টিকে থাকার লড়াইয়ে ম্লান হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে কঠোর আইন একটি শক্ত দেয়াল হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে আইন প্রয়োগ করে বা জোর খাটিয়ে শিশুদের সত্য বলা শেখানো কঠিন, কারণ এতে তাদের মধ্যে নৈতিকতার বদলে ভয় তৈরি হতে পারে। শিশুরা তখন শাস্তি থেকে বাঁচতে আরও নিপুণভাবে মিথ্যা বলতে শেখে। কিন্তু একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তাদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। নিচে কিছু কার্যকর উপায় দেওয়া হলো: দেশে আইন বা নিয়ম এমন হওয়া উচিত যাতে শিশু ভুল করলে তা অকপটে স্বীকার করতে পারে। তাকে আশ্বস্ত করুন যে, মিথ্যা বলার চেয়ে সত্য বলে ভুল স্বীকার করলে শাস্তি কম হবে বা ক্ষমা পাওয়া যাবে। পরিবারে এবং স্কুল কলেজেও ভয়ের বদলে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সত্য বলার জন্য কোনো ধরাবাঁধা পুরস্কার না হোক প্রশংসামূলক আচরণ করা উচিত। শিশু কোনো কঠিন সত্য স্বীকার করলে তার সাহসের প্রশংসা করতে হবে। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
বড়দের আইনের মতো কঠোর না হয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে নৈতিক গল্পের বই পড়া বা শিক্ষণীয় সিনেমা দেখার অভ্যাস করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এটি তাদের অবচেতন মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
শিশুরা যদি মিথ্যা বলে, তবে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত না করে তার প্রিয় কোনো কাজ যেমন: টিভি দেখা বা খেলা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখার মতো শাস্তি বা নিয়ম কার্যকর করা যেতে পারে। এতে সে কাজের পরিণাম সম্পর্কে সচেতন হবে। মোটকথা শিশু–কিশোরদের জন্য আইন হতে হবে স্নেহও শৃঙ্খলার সমন্বয়, ভয়ের শাসন নয়। নৈতিকতা ভেতর থেকে আসে, যা কেবল ভালোবাসা এবং সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমেই গড়ে তোলা সম্ভব। মিথ্যা মানুষকে দুশ্চিন্তা ও ভয়ের মধ্যে রাখে। একটি মিথ্যা ঢাকতে আরও দশটি মিথ্যা বলতে হয়। সত্য বলার চর্চা থাকলে মানুষের মানসিক চাপ কমবে এবং সমাজের সামগ্রিক নৈতিক মান উন্নত হবে। এক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষা হচ্ছে ভিত্তি, আর কঠোর আইন প্রয়োগ হচ্ছে সেই ভিত্তিকে ধরে রাখার সুরক্ষা দেয়াল।
লেখক : কবি ও গল্পকার












