সহিংসতায় বেড়ে উঠছে প্রজন্ম!

হাসান মেহেদী | বুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ

মানব শিশু নিষ্পাপ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিক নানা প্রভাবের মধ্য দিয়ে তার চিন্তা, আচরণ ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে কিশোরতরুণদের একটি অংশের মধ্যে রাগ, অসহিষ্ণুতা, মারামারি, হুমকি, প্রতিহিংসা ও নানা ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণ ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। মনে রাখতে হবে, একটি শিশু সহিংস হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। তাহলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক একটি ‘সহিংস প্রজন্ম’ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? এর জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী কে? এর দায় কি শুধু তরুণদের? নাকি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতিরও দায় রয়েছে? বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

মনে রাখা দরকার, সহিংসতা শুধু মারামারি বা শারীরিক আঘাতের নাম নয়। কাউকে অপমান করা, ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, দুর্বলকে দমন করা, অনলাইনে কাউকে হয়রানি করা, গুজব ছড়ানো কিংবা ভিন্নমতকে সহ্য না করাও এক ধরনের সহিংস আচরণ। মানুষের প্রতি সম্মান হারানো এবং যুক্তির পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করে। তাই সহিংস প্রজন্ম বলতে এমন একটি প্রজন্মকে বোঝায়, যার একটি অংশ সমস্যা সমাধানে আলোচনা ও যুক্তির পরিবর্তে রাগ, ভয় দেখানো বা পেশিশক্তি প্রয়োগকে সহজ পথ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

শিশুর মানসগঠনে প্রথমেই আসে পরিবারের প্রসঙ্গ। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো তার নিজের পরিবার। একটি শিশু তার সঙ্গীর সাথে কী ধরনের আচরণ করবে, কীভাবে কথা বলবে, কী ধরনের মূল্যবোধ পোষণ করবে কিংবা অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা সবই পরিবার থেকেই পায়। কোনো পরিবারে যদি নিয়মিত ঝগড়াবিবাদ, অপমানজনক ভাষা ব্যবহার, অশ্রদ্ধা কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যায়, তবে সেই পরিবারের শিশু সেটিকে মানুষের স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে। আবার অনেক পরিবারে সন্তানের ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। সন্তান অন্যায় করলেও তাকে শাসন না করে উল্টো তার পক্ষ নেওয়া হয়। এতে শিশুর মধ্যে নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি হয় না। অন্যদিকে অতিরিক্ত কঠোরতা, অপমান বা শারীরিক শাস্তিও শিশুর মনে ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি করতে পারে। তাই পরিবারকে ভালোবাসা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

পরিবারের পরেই একটি শিশুর চরিত্র গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; একজন ভালো মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় নম্বর, পরীক্ষার ফলাফল ও প্রতিযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নৈতিক শিক্ষা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, দলগত কাজ এবং দ্বন্দ্ব শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের শিক্ষা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। এটি শিশুর মানসগঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুর চরিত্র গঠনে শিক্ষকশিক্ষার্থীর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তার সমস্যাকে বুঝতে চেষ্টা করেন এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ দেন, তাহলে শিক্ষার্থী দায়িত্বশীল হতে শেখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউকে অপমান, বুলিং বা বৈষম্যের শিকার হতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ দীর্ঘদিনের অপমান ও ক্ষোভ একজন শিক্ষার্থীর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এর পরেই আসে পরিবেশের প্রভাব। একজন তরুণ যে সমাজে বেড়ে ওঠে, সেই সমাজ তার চিন্তাকে প্রভাবিত করে। সমাজে যদি অন্যায়, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসহিষ্ণুতা এবং শক্তিশালী ব্যক্তির অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি থাকে, তাহলে তরুণদের একটি অংশ ভুল শিক্ষা পায়। তারা ভাবতে পারে ক্ষমতা থাকলে নিয়ম ভাঙা যায়, দুর্বলকে দমন করা যায় এবং অন্যের অধিকারকে উপেক্ষা করা যায়। এটি বর্তমানে একটি সামাজিক ছোঁয়াচে ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।

শিশুকিশোরদের মধ্যে সহিংসতার বিস্তারে সোশ্যাল মিডিয়াও অনেকাংশে দায়ী। তথ্যপ্রযুক্তির সহজ প্রাপ্যতা ও অবাধ ব্যবহার মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব ছড়ানো, সাইবার বুলিং এবং ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রকাশের সুযোগও তৈরি করেছে। একটি ছোট ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এছাড়া সহিংসতা বা নেতিবাচক আচরণকে সাহস, জনপ্রিয়তা বা শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখানো চলচ্চিত্র, নাটক, ভিডিও বা অনলাইন গেম শিশুকিশোরদের চিন্তা ও আচরণে অযাচিত পরিবর্তন আনতে পারে।

সহিংসতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিক্ষা, মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও সহমর্মিতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তরুণরা শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।

লেখক : কলেজ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতাদের ফেরাতে হবে সুন্দরের পথে
পরবর্তী নিবন্ধদুরের টানে বাহির পানে