পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম অরণ্যবেষ্টিত পাহাড়ি অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, পূর্বে মিজোরাম, পূর্ব–দক্ষিণে মিয়ানমার এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান। ৫,০৯৫ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে এর বিস্তৃতি। এটি বাংলাদেশের প্রায় এক–দশমাংশ। পার্বত্য এই অঞ্চল প্রায় পুরোটাই পাহাড়ে ঢাকা। উত্তর থেকে দক্ষিণের পাহাড়শ্রেণি তুলনামূলকভাবে খাড়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চল তথা খাগড়াছড়ি থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে বয়ে গেছে তিনটি নদী যথাক্রমে চেঙ্গী, মাইনী এবং কাচালং। এই তিন নদীকে ঘিরে তিনটি উপত্যকা চেঙ্গী, মাইনী এবং কাচালং। দক্ষিণে তথা বান্দরবানকে ঘিরে রয়েছে তিনটি নদী যথাক্রমে সাঙ্গু, মাতামুহুরী আর রাইকিয়াং এবং এদের ঘিরে রয়েছে তিনটি উপত্যকা। মাঝখানে রাঙামাটি বুকে ধরে আছে বিপুল জলরাশির মানবসৃষ্ট কাপ্তাই হ্রদ। এ হ্রদ প্রায় ৩৫০ বর্গমাইল বিস্তৃত। এ হ্রদ পার্বত্য মানুষের জীবনে অনেক বেদনাবিধুর ও বিষাদময় উপাখ্যানেরও সাক্ষী। এ হ্রদ বহু অরণ্যসন্তানকে গৃহহীন করেছে। তাঁদের বাড়িঘর, জমিজিরাত তলিয়ে গেছে এ হ্রদের গভীরে। এসব এখন সেই সব মানুষের, যাঁরা এখনও বেঁচে আছেন, তাঁদের কাছে করুণ, দুঃসহ স্মৃতি জাগানিয়া দীর্ঘশ্বাস কেবল। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বনভূমি প্রায় ১,৪০০ বর্গমাইলজুড়ে। এই সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে কাচালং, সাঙ্গু, রাইকিয়াং এবং মাতামুহুরী অঞ্চল অন্যতম।
সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম মোট ৩৬৫টি মৌজা নিয়ে গঠিত। প্রতি মৌজায় রয়েছেন একজন হেডম্যান। কয়েকটি পাড়া নিয়ে একটি মৌজা। প্রতিটি পাড়া একজন কারবারির শাসনাধীন। প্রকৃতির অপূর্ব লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৮৬০ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীকালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। ১৮৮১ সালের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপে তিনটি সার্কেলকে যথাক্রমে চাকমা, বোমাং এবং মং সার্কেল হিসেবে নামকরণ করা হয়। চাকমা সার্কেলের সদর দপ্তর করা হয় রাঙামাটিতে, এর আয়তন ২,৪২১ বর্গমাইল। বোমাং সার্কেলের সদর দপ্তর করা হয় বান্দরবানে, এর আয়তন ২,০৬৪ বর্গমাইল এবং মং সার্কেলের সদর দপ্তর করা হয় মানিকছড়িতে, এর আয়তন ৬৫৩ বর্গমাইল।
১৯৮৩ সালে এই তিনটি সার্কেল চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেলকে তিনটি পার্বত্য জেলা, যথাক্রমে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাঙামাটি জেলার অধীনে উপজেলা ১০টি, খাগড়াছড়ির অধীনে উপজেলা ৮টি এবং বান্দরবান জেলার অধীনে উপজেলা রয়েছে ৭টি। ৬ মার্চ ১৯৮৯ সালে বলবৎকৃত স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন অনুযায়ী তিনটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ এবং জেলা প্রশাসক দ্বারা শাসিত হচ্ছে।
এ তথ্যগুলো আমি পূর্বের লেখায়ও উল্লেখ করেছি। তবুও বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে পাঠকদের সামনে আবারও তুলে ধরলাম। পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবসৃষ্ট কাপ্তাই হ্রদ যেমন এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বাড়িঘরসহ সহায়–সম্পত্তি হারানোর কারণে ক্ষোভের জন্ম দেয়, তেমনি এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিও সে ক্ষোভে ইন্ধন জোগায়। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ আলাপ–আলোচনান্তে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসি জেএসএস) মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নানা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ চুক্তি পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও অগ্রগতি অর্জনের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
শান্তিচুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব: পার্বত্য চুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এ চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরাশক্তিসমূহের ‘বাফার অঞ্চল’ হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। একসময় ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরাশক্তিসমূহের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
শান্তিচুক্তির অর্থনৈতিক দিক: এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যের অন্যতম এক পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফল, বিশেষ করে আম, আনারস, কাঁঠাল ও তরমুজ সারাদেশের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবারিত পর্যটন সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নবযুগের সূচনা করতে চলেছে।
শান্তিচুক্তির সামরিক গুরুত্ব: এ চুক্তি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘নিজ দেশে যুদ্ধরত’ অপবাদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে। ফলে সগৌরবে সামরিক বাহিনী বহির্বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়ার অবকাশ পেয়েছে।
চুক্তির এপিঠ–ওপিঠ: চুক্তির মোট ৭২টি ধারার ৪৮টি সম্পূর্ণ এবং ১৫টি আংশিক বাস্তবায়িত এটি সরকারি ভাষ্য। জনসংহতি সমিতির ভাষ্য, চুক্তির ২৫টি বাস্তবায়িত, ১৮টি আংশিক এবং ২৯টি সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত।
চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক ভূমিবিরোধ। ১৯৯৯ সালে এ প্রসঙ্গে কমিশন গঠিত হলেও এখানে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও অপরিলক্ষিত।
চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ তিন জেলা তথা তিন সার্কেল তথা তিন স্থানীয় পরিষদের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীত অশান্তির যে মাত্রা ছিল, তা এখন অনেকাংশে দূরীভূত। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও কাঙ্ক্ষিত সার্বিক শান্তি বিরাজমান নয়। অন্তঃকোন্দল এখনও মাঝে মাঝে পাহাড়ে রক্ত ঝরায়। সামপ্রতিক সময়ে চলমান সাজেকের পথে পর্যটকদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি এসবেরই অংশ কেবল।
ঘটনার সূত্রপাত: ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিকে ঘিরে প্রসীত খীসার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) গঠিত হয়। ইউপিডিএফ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসি জেএসএস) শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে এবং এই চুক্তির বিপক্ষে জনমত গঠন ও সশস্ত্র আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়। সেই থেকে ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসি জেএসএস) মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত–সংঘর্ষ চলে আসছে। এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও দুটি নতুন দলের সৃষ্টি হয়, যথাক্রমে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং পিসি জেএসএস (লারমা)। নতুন এই দুটি দল নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আলাপ–আলোচনা এবং সন্দেহ বিদ্যমান।
মূল দল ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসি জেএসএস) দ্বন্দ্ব–সংঘাত ১৯৯৭ সাল থেকে চলমান। উল্লেখ্য, এই দ্বন্দ্ব ১৯৯৭–পূর্ব পিসি জেএসএস (লারমা) ও পিসি জেএসএস (প্রীতি)-এর মতো আদর্শিক দ্বন্দ্ব নয়; এ দ্বন্দ্ব আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে।
সাজেককেন্দ্রিক বর্তমান চলমান সংকটও এই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারজনিত।
পানছড়ি–সাজেক তথা সার্বিকভাবে খাগড়াছড়ি অঞ্চলে ইউপিডিএফের প্রভাব বিদ্যমান। পিসি জেএসএস, ইউপিডিএফের এই প্রভাব খর্ব করতে সামপ্রতিককালে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পিসি জেএসএসের এই মরিয়া প্রচেষ্টাই বর্তমানে সাজেক অঞ্চলে দুই পক্ষের সংঘাতের মূল কারণ। বিভিন্ন সূত্র এবং সরকারদলীয় দুই এমপির সঙ্গে বৈঠক শেষে ইউপিডিএফের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধির বক্তব্য এমন একটি ধারণার জন্ম দিয়েছে যে পিসি জেএসএসের সাজেক অঞ্চলে অবস্থান গ্রহণে কর্তৃপক্ষের মদদ রয়েছে। এটি সত্যি হলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে।
সাজেকের রাস্তা উন্মুক্ত করার আলোচনায় পিসি জেএসএসকে সাজেক থেকে সরিয়ে বা হটিয়ে দেওয়ার দাবি তোলা হয়। সরকারদলীয় উপস্থিত দুই এমপি এ দাবি পূরণে প্রথমে এক মাস, পরে দুই সপ্তাহের সময় চান। পরে সম্ভবত দফারফা হয় পাঁচ দিনের সময়সীমায়। প্রশ্ন হলো, দুটি সশস্ত্র দলকে পরস্পরের অবস্থান থেকে সরানো বা না সরানোর ক্ষমতা বা দায়িত্ব কেন বেসামরিক কর্তৃপক্ষ বা সরকার নিতে যাবে? বরং প্রশ্ন উঠতে পারত, তাদের হানাহানিতে এ দেশের সাধারণ মানুষ কেন ভোগান্তিতে পড়বে? কেন ভরা পর্যটন মৌসুমে সাজেকের ব্যবসায়ীরা আয়বঞ্চিত হবে? বরং বলা যেত, নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হলো এই সময়ের পর সাজেকের কোনো এলাকায় কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বরদাশত করা হবে না।
সরকারের অবস্থান এখানে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিচায়ক, যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা একটি স্বাভাবিক বিষয়!
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে ভূরাজনীতির পাশাপাশি ভূকৌশলগত অবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে যাঁদের এসব বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রয়েছে, তাঁদের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বিরাজমান সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় সমস্যা কেবল জটিলতর রূপই ধারণ করবে।
এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর দেশে দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে আনার যে অভিজ্ঞতা, তা থেকে দেখা গেছে, সামরিক বাহিনী প্রথমত সশস্ত্র গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপের বাতাবরণে নিয়ে আসে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সুযোগ গ্রহণ করে সমাধানের পথ খুঁজে নেয়। এ ক্ষেত্রে দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপরিহার্য। আমাদের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় যেন না হয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












