চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডিয়াম গঠিত হয়েছে। সদ্য সম্পন্ন দ্বি–বার্ষিক নির্বাচনে বিজয়ী ২৪ পরিচালক গতকাল সোমবার সকালে সভা করে এই প্রেসিডিয়াম গঠন করেন। এতে মোহাম্মদ আমিরুল হক সভাপতি, মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী সিনিয়র সহ–সভাপতি ও মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন সহ–সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। নয়া প্রেসিডিয়াম গঠনের মাধ্যমে একযুগ পর ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্বের হাতে চট্টগ্রাম চেম্বারের দায়িত্ব হস্তান্তর হলো।
গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারস্থা চেম্বারের কনফারেন্স রুমে নির্বাচন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চেম্বারের নবনির্বাচিত বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সের অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চেম্বার প্রশাসক ও অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. মোতাহার হোসেন, নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম ও সদস্য মো. হেদায়েত উল্যাহ উপস্থিত ছিলেন। সভায় নির্বাচন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নবনির্বাচিত পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে নবনির্বাচিত পরিচালকমণ্ডলী থেকে প্রেসিডিয়াম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডিয়াম গঠনের পর একযুগ পর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত চেম্বারের নয়া নেতৃত্বের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন চেম্বারের প্রশাসক ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. মোতাহার হোসেন।
আগামী মেয়াদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি ইতোপূর্বেও চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক ছিলেন। আমিরুল হক সীকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সফল নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে শিপিং, লজিস্টিকস, সিমেন্ট, জ্বালানি, এলপিজি, ভোজ্যতেল, কৃষি, রিয়েল এস্টেটসহ বহুমুখী খাতে সীকম গ্রুপ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি–এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি কর্পোরেট গভর্ন্যান্স, উৎপাদনশীলতা ও শিল্প ব্যবস্থাপনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সম্মাননা অর্জন করেছেন।
আমিরুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাজ্য থেকে লিডারশীপ অ্যান্ড সাস্টেনএ্যাবিলিটি বিষয়ে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং তিনি যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইনস্টিটিউটের ফেলো। পাশাপাশি তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যবসা–বাণিজ্য বিষয়ে সভা, সেমিনারের রিসোর্সপার্সন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ব্যবসায়িক অঙ্গনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক এবং সার্ক চেম্বারের আজীবন সদস্য। দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি–সিআইপি সম্মাননায় ভূষিত করেছেন। সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সমানভাবে সম্পৃক্ত। তিনি রোকনূর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি এবং বিভিন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, বাংলাদেশ জাতীয় যক্ষ্মা প্রতিরোধ সমিতি, চট্টগ্রাম ডায়বেটিক সমিতি, চিটাগাং ক্লাব লি., চিটাগাং সিনিয়র্স ক্লাব, চিটাগাং বোট ক্লাব এবং শাহীন গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাবের আজীবন সদস্য।
নবনির্বাচিত সিনিয়র সহ সভাপতি মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন চৌধুরী রাইজিং কম্পিউটার স্কেলের স্বত্বাধিকারী। তিনি ইতোপূর্বে চেম্বারের পরিচালক ছিলেন। দেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক অঙ্গনের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন ধরে শিল্পায়ন, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, স্টিল, পরিবহন ও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি বর্তমানে রাইজিং গ্রুপ অব কোম্পানিজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে এম কম ডিগ্রি অর্জন করেন। এই শিল্পোদ্যোক্তা ব্যবসায়িক নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এর আগে চিটাগং চেম্বারের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি চিটাগাং ক্লাব, ভাটিয়ারী গলফ ক্লাব, চিটাগাং সিনিয়রস ক্লাব ও বাংলাদেশ রি–রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, চিটাগং লায়ন্স ফাউন্ডেশন ও মা ও শিশু হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্য এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দেশ–বিদেশে শিল্প ও ব্যবসা খাতে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব তাঁকে একজন সফল উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নব–নির্বাচিত সহ–সভাপতি মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন মনোয়ারা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন। তিনি চট্টগ্রামের ব্যবসা, ক্রীড়া ও সামাজিক অঙ্গনের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। তিনি একাধারে সফল উদ্যোক্তা, ক্রীড়া সংগঠক এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত একজন সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত। তিনি চট্টগ্রামের কেএম স্পোটিং ক্লাবের সভাপতি, সিজেকেএস ফুটবল কমিটির সহ–সভাপতি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান, বার্থ অপারেটর্স, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর্স অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটর ওনার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, চট্টগ্রামের ডেপুটি গভর্নর এবং চট্টগ্রাম মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের সাবেক সভাপতি। তিনি মা ও শিশু হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম জেলা রেফারি এসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের দাতা সদস্য এবং চট্টগ্রাম ক্লাব লি. চট্টগ্রাম সিনিয়র্স ক্লাব, চট্টগ্রাম খুলশী ক্লাব, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম খেলোয়াড় সমিতি, বাংলাদেশ জেলা এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠক এসোসিয়েশন বীচ সকার (ফুটবল) কমিটি, নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য।
চেম্বারের নবনির্বাচিত অন্যান্য পরিচালকরা হলেন –রাজা কর্পোরেশনের কামাল মোস্তফা চৌধুরী, ইস্টার্ন অ্যাপারেলস লিমিটেডের মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী, চুমকি অ্যাপারেলস লিমিটেডের আবু হায়দার চৌধুরী (আমজাদ), স্টিভিডোর ফ্রেন্ডস সিন্ডিকেট লিমিটেডের আমান উল্লা আল ছগির, পিএইচপি মোটরসের মোহাম্মদ আকতার পারভেজ, এম. এন্টারপ্রাইজের মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, অর্কিড ট্রেডিংয়ের মোহাম্মদ সাজ্জাদ উন নেওয়াজ, পাবলিক ইলেকট্রিকের আফসার হাসান চৌধুরী, চট্টগ্রাম ট্রেড এজেন্সীর এস এম সাইফুল আলম, প্রান্তিক মেরিন সার্ভিসেস লিমিটেডের মো. গোলাম সরওয়ার, জার ট্রেডের মো. জাহিদুল হাসান, টার্নিং পয়েন্টের আসাদ ইফতেখার, দি ফোর হুইলারসের মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ফাল্গুনী ট্রেডার্স লিমিটেডের এ এস এম ইসমাইল খান, মার্স মেরিটাইম সার্ভিসেস অ্যান্ড ইন্সপেকশনের ক্যাপ্টেন মো. আলাউদ্দিন আল আজাদ, জেএসএন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, স্বদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (ইউনিট–২)’র মো. নুরুল ইসলাম, সাহির ট্রেডের সরোয়ার আলম খান, স্ট্যান্ডার্ড লজিস্টিঙ সার্ভিসেসের শহীদুল আলম, নিউ কর্ণফুলী ট্রেডিংয়ের মোহাম্মদ শফিউল আলম ও জেকো এন্টারপ্রাইজের মো. সেলিম নুর।
এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রাম চেম্বারের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবসায়ী সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দায়িত্ব পালনকালে আমি মর্যাদা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখেই চেম্বার পরিচালনা করব। আমার নীতি হবে, ‘দল হবে যার যার, চেম্বার হবে সবার’।
আত্মীয়স্বজনের পরিচয়কে সামনে আনতে চান না উল্লেখ করে চেম্বার সভাপতি আরও বলেন, আমার একজন ফার্স্ট কাজিন এখানে আছেন, কিন্তু আমি কারও পরিচয় দেবো না। যতক্ষণ আমি ডিগনিটির সঙ্গে চেয়ার চালাতে পারবো, ততক্ষণ থাকবো। যেদিন মনে হবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছি, সেদিন চেয়ার ছেড়ে দেবো।
তরুণ উদ্যোক্তা ও নারীদের সম্পৃক্ত করে একটি রিফর্ম কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, আইটি ছাড়া বাংলাদেশ চলবে না। এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। শুধু বস্তা বস্তা কাগজ বানিয়ে লাভ হবে না। তিনি বলেন, কোনো সমালোচনা থাকলে তা প্রকাশ্যে না এনে সরাসরি তাকে জানাতে। আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সবার কাছে থাকবে। আপনারা ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ করতে পারবেন। চট্টগ্রামের শিল্পখাতের বর্তমান অবস্থা নিয়েও কথা বলেন নবনির্বাচিত সভাপতি। তিনি জানান, একসময় চট্টগ্রামে ৬৫০টি গার্মেন্টস কারখানা থাকলেও বর্তমানে তা কমে ২৫০টিতে নেমে এসেছে। শিপ ব্রেকিং শিল্প পরিবেশগত অজুহাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দাবি করে এ ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দিলে অর্থনীতি চলবে কীভাবে?
রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা নেই জানিয়ে আমিরুল হক বলেন, আমার দর্শন হলো, একজন ব্যবসায়ীর রাজনীতিতে যাওয়া উচিত নয়। তবে চেম্বারে এসে সবাইকে এক পরিচয়ের বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, এখানে আসার পর সবাই এই চেম্বারের মানুষ, ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি।












