জলাবদ্ধতা প্রকল্পে থাকছে না আর্থিক সংকট

অর্থায়নের ধরন সংশোধন, দেড় হাজার কোটি টাকার সংস্থান করল সরকার দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে : সিডিএ

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ২৬ মে, ২০২৬ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

আর্থিক সংকটে পড়া চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প অবশেষে শেষ রক্ষা হয়েছে। সরকার প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সংস্থান করায় প্রকল্পটিতে আর কোনো আর্থিক সংকট থাকছে না বলে জানিয়ে সিডিএ সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ভূমির ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সূত্রে জানা যায়, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে বছর কয়েক আগে। ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে দফায় দফায় সময় ও খরচ বেড়ে প্রকল্প ব্যয় ইতোমধ্যে ৮ হাজার ৫৯১ কোটি ১৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের পাশাপাশি খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, খাল থেকে বালি ও মাটি উত্তোলন এবং নগরীর বিভিন্ন স্থানে নালা নির্মাণ করা হচ্ছে। সিডিএ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু করে।

২০১৯ সালে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের জুন মাসে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, প্রয়োজনীয় অর্থের যোগানসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির কাজ ব্যাহত হয়। খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের আওতায় ৩৬ খাল রয়েছে। এর মধ্যে আমরা ৩৪টি খালের কাজ পুরোপুরি শেষ করেছি। এসব খাল খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার এবং দুই পাশের রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সিডিএর একজন প্রকৌশলী জানান, প্রকল্পটির আওতায় ৩৬টি খালের দুই পাশে ১৭৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। এই রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের সময় খালপাড়ের বহুতল ভবন রক্ষা করতে শিট পাইল করতে হচ্ছে, যা প্রকল্পের শুরুতে ছিল না। এতেও ব্যয় বাড়ছে। এর বাইরে প্রকল্পে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ১৫ কিলোমিটার নালা নির্মাণ করার ব্যয় ধরা হয়েছিল। মাঠ পর্যায়ে কাজে নেমে দেখা যায়, নালা নির্মাণ করতে হবে ৯০ কিলোমিটার। এতে ব্যয় হয় ৩৫৮ কোটি টাকা। রাস্তার পাশের নালা নির্মাণে খরচ বেড়ে গেছে ৩৫৪ কোটি টাকা।

প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণকালে ধরা হয়েছিল, ৩৬টি খাল থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার ঘনফুট কাদা অপসারণ করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ২৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কিন্তু কাজ শুরু করার পর ক্রমান্বয়ে হিসাব পাল্টাতে শুরু করে। ৩৬টি খাল থেকে মোট ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ঘনফুট কাদা সরানো হচ্ছে। খাল সম্প্রসারণে মোট ৫ লাখ ২৮ হাজার ঘনফুট মাটি কাটার কথা ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে ২১ লাখ ঘনফুট মাটি কাটতে হয়। এতে ব্যয় হয় ১৭০ কোটি টাকা। প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে। বেড়েছে লেবার কস্টও। পদে পদে, খাতে খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে প্রকল্প ব্যয় চারপাঁচ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এভাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেলেও টাকার সংস্থান হচ্ছিল না। প্রকল্পটিতে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি ৭৫৩ কোটি টাকা ছিল সরকারের কাছ থেকে সিডিএর ঋণ, যা ৫ শতাংশ সুদে ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে পরিশোধ করার কথা ছিল। একইসাথে ৭৫০ কোটি টাকা সিডিএ নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিডিএর নিজস্ব অর্থায়নের সুযোগ না থাকার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সঙ্গতি না থাকায় প্রকল্পের ১৫০৩ কোটি টাকা অর্থায়ন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এতে করে ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান ছাড়াও প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা সরকারি ঋণকে অনুদান হিসেবে অর্থায়নের ধরন পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু ৭৫৩ কোটি টাকা সিডিএর নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দিতে বলা হয়। ১০৩ কোটি টাকা সরকারি ঋণ হিসাবে থাকে।

নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে সিডিএর পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি উপস্থাপন করে প্রকল্পের অনিশ্চয়তা তুলে ধরা হয়। সিডিএ থেকে প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করতে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হলে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থায়নের ধরন সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করে এবং প্রায় ১০৩ কোটি টাকা সরকারি ঋণ ছাড়া প্রকল্পের বাকি অর্থ সরকারের অনুদান হিসেবে প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ সিডিএকে এই প্রকল্পে নিজস্ব কোনো অর্থায়ন করতে হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা ছাড়াও ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল তার নিরসন হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফারুক আহাম্মেদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. নুরুল করিম আজাদীকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অর্থায়নে যে সংকট তৈরি হয়েছিল মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তা নিরসন হয়েছে। এতে চট্টগ্রামবাসীর জন্য অনেক বড় একটি সংকটের সুরাহা হলো। তিনি বলেন, মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণেই এমন জনমুখী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করা হবে বলে জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসভাপতি আমিরুল হক, সি. সহসভাপতি আমজাদ হোসেন, সহসভাপতি মসিউল
পরবর্তী নিবন্ধশিশু আয়াত হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৭ জুন