শিশুর চোখের কিছু সচরাচর অসুখ

ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী | মঙ্গলবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ

চোখ পুরো শরীরের আয়নার মত। দেহে বিদ্যমান অনেক অসুখের চিহ্ন প্রথমে চোখের উপসর্গ রূপে দেখা দেয়। শিশু চিকিৎসক শিশু-বয়সের এ-সকল উপসর্গাদি দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পাশাপাশি চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ চাইতে হলে সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। শিশুর চোখের এসব উপসর্গাদি দেখা গেলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। এতে করে শিশুর দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পাওয়ার আগে যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ বজায় থাকে।
১. চোখ লাল হওয়া- শিশুর চোখ লাল বা ‘রেড আই’ এর কারণাদি হলো কনজাংটিভাইটিস্‌, কেরাটাইটিস্‌, কেরাটো-কনজাংটিভাইটিস্‌, গ্লুকোমা ও ইউ-ভাইটিস্‌। এসব রোগ শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গে বা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়া ব্যাধির লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

২ চোখে পুঁজ- এ অসুখে নেত্রনালী বন্ধ থাকার কারণে ভূমিষ্ঠকাল থেকে চোখ থেকে পানি ঝরে। চোখে কোনো বাইরের বস্তু ঢুকে থাকলে অথবা চোখের সংক্রমণ হলেও চোখ থেকে পুঁজ পড়ে। কারণের উপর নির্ভর করে চোখের পুঁজের সাথে চোখ ব্যথা থাকতে পারে।

৩. চোখ চুলকানো- এলার্জি জনিত কনজাংটিভাইটিস্‌্‌, সেবোরীক্‌ ব্লেফেরাইটিস- প্রধানত চোখের এই দুটো অসুখে চোখ চুলকায়। তবে ছোট্ট শিশুদের চোখ চুলকানো বা সর্বদা চোখের পাতা ঘষতে থাকা উপসর্গ চোখের ভেতরে কোনো বস্তু বা ‘ফরিক্স্‌্‌ বডি’-র উপস্থিতি, কিংবা চোখের দৃষ্টি শক্তির ত্রুটিজনিত কারণে হয়। যেসব শিশু অনবরত চোখ ঘষে, তাদের সম্পূর্ণ চক্ষু পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষত চোখের দৃষ্টিশক্তির গরমিল (রিফ্রেকটিভ এর্‌) নির্ণয় করা দরকার।

৪. চোখে কম দেখতে পাওয়া বা ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি- কোনো কোনো শিশুতে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ থাকার কোনোরূপ উপসর্গ মোটেই বোঝা যায় না। তার প্রধান কারণ এই-শিশুর দৃষ্টিশক্তি যে ক্ষীণ, সে সম্পর্কে শিশু ব অন্যদের ধারণা থাকে না।

০৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্মান্ধতা সহজে নিরূপন করে যায় না। এবং এজন্য অনেক উন্নত মানের টেস্টের প্রয়োজন পড়ে। ১ থেকে ৩ বছরের শিশু ছোট ছোট বস্তু চিহ্নিত করতে পারে। ৩ বছরের বেশি বয়সী শিশুকে ‘স্নেলেন চার্ট’ ব্যবহার পূর্বক শিশুর কম দৃষ্টিশক্তি অসুখ শনাক্ত করা সম্ভব।

ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির প্রধান উপসর্গাদি-
বারে বারে হাত দিয়ে শিশু চোখ ঘষা, বা ঘন ঘন চোখের সংক্রমণ
কখনো-বা শিশুর ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি বিদ্যালয় শিক্ষকের নজরে আসে
কোনো শিশুর এক চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ থাকলে তার স্বাভাবিক চোখ যদি হাত দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, তবে শিশুর আচরণে অস্থিরতা প্রকাশ পায়
শিশুর চোখ অনবরত নড়াচড়া করতে থাকলে (নিসটেগমাস্‌্‌), শিশুটি ক্ষীণ দৃষ্টি শক্তির শিকার-এটা ধরে নিয়ে অতিসত্তর তাকে চক্ষু বিশেষজ্ঞের দ্বারা চোখ পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।

৫. অক্ষিগোলকের নানা জন্মত্রুটি- কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর চোখের গোলক বাইরের দিকে বেশ বেরিয়ে আসে (প্রোপটোসিস্‌্‌)। দুই চোখের মাঝখানে বেশি দূরত্ব, দৃষ্টিশক্তি চোখের পশ্চাতে প্রক্ষিপ্ত হওয়া ইত্যাদি সমস্যাও জন্মগতভাবে দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে কখনো কখনো অক্ষিগোলকের চারপাশে থাকা অস্তি সমূহের সমস্যা জড়িত থাকে।

৬. চোখের পাতা ও নেত্রনালীর সমস্যা-
ক.টোসিস-শিশুর উপরে চোখের পাতা বেশ নিচের দিকে নেমে এসে চোখ দুটি বুজে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করে। এ অসুখ জন্মগতভাবে বা পরবর্তীতে রোগের কারণে ঘটতে পারে।
খ.এ ছাড়াও জন্মগতভাবে বা ইনফ্লুয়েঞ্জা, মাম্পস্‌ ইত্যাদি চোখের সংক্রমণে শিশুর চোখের নেত্রনালী বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিশুর চোখ থেকে পানি ঝরে।

৭. ট্যারা চোখ (এস্‌কুইন্ট) এবং রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তি লোপ-
ক. ট্যারা চোখ-শিশুর চোখের চারপাশে থাকা মাংসপেশীর সমস্যা, গর্ভকালীন সময়ে চোখে আঘাত ও স্নায়ুতন্ত্রের নানা অসুখ-বিসুখে শিশুর চোখে ট্যারা অসুখের সূত্রপাত ঘটতে পারে।
খ.শিশুর এ ভিটামিন, বি২ বা রিবোফ্লেবিন, বি১বা থায়ামিন, ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি প্রভৃতির অভাবজনিত কারণে ও অতিরিক্ত ডোজজনিত কুইনাইন ওষুধের পয়জনিং এবং নানা শারীরিক অসুখে রাত্রিকালীন চোখে না দেখা অসুখে ভোগে।

লেখক : সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও প্রফেসর, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ,
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।