মানবসভ্যতা বিকাশের অন্যতম উপায় হলো শিক্ষা অর্জন। বর্তমানে শিক্ষা অর্জন ব্যাপারটা গৌণ হয়ে মুখ্য হয়ে গিয়েছে সার্টিফিকেট অর্জন। সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি পাওয়া যায়, এটা সত্যি। যদি পড়ালেখা করে সেই সার্টিফিকেটে চাকরি হয়, তো ভালোই, কিন্তু কয়জনে চাকরি পাচ্ছে! বেকার হয়ে রয়ে গেছে শত শত সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থী। সারা বাংলাদেশে বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে শিক্ষার মানের উন্নয়ন অনেক পিছিয়ে। শিক্ষার মান ধরে রাখতে যেসব প্রধান অনুষঙ্গ প্রয়োজন সে সব ‘গোয়ালে আছে বাস্তবে নেই’ এর মতো।
বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি মানসম্মত শিক্ষাক্রম। প্রতি দশবছর পর শিক্ষাক্রমের পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার এসেই আগের সরকারে চলমান শিক্ষাক্রমকে সমূলে উৎপাটন করে ১৪ বছর আগের সেই সরকারের দেওয়া ব্যর্থ শিক্ষাক্রম, সৃজনশীল শিক্ষাক্রমকে শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে পিছনে টেনে ধরলেন।
সৃজনশীল শিক্ষাক্রম ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল সরকার কর্তৃক শিক্ষকদেরকে সৃজনশীল পদ্ধতি পড়ানোর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হওয়া। এটার ফলে শিক্ষার্থীরা এক রকমের দুর্বিপাকেই পড়ে আছে। প্রচুর শিখন ঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস পার করতে হয় এবং পাশ করে যায়। ফলে যা হওয়ার তাই হয় তৃতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী শুদ্ধ করে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারে না, পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণির অংক করতে পারে না। ইংরেজি নিয়ে বলার তো প্রয়োজন পড়ছেই না। গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাথমিকে যারা পড়াশোনা শেষ করেছে, তাদের অর্ধেকের বেশির মৌলিক দক্ষতা নেই। গ্রামের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। ১০ বছরের শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩২ শতাংশ পড়তে পারে ও গণিত বোঝে। অর্থাৎ প্রতি দশজনের ৭ জন পারছে না।
এবার বর্তমানে হয়তো আশার বাণী শুনতে পাছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সকলে। বর্তমানে শিখন ঘাটতি পূরণে একটি নির্দেশনা পত্র জারী করা হয়েছে এবং এটা বাস্তবায়নও চলমান। পবিত্র রমজান মাস জুড়ে বিদ্যালয়ে ছুটি থাকায় শিখন ঘাটতি পূরণে ছুটি শেষে ক্লাস শুরুর পর পরবর্তী ১০টি শনিবারে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম আরম্ভ হয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আলো কার্যালয়ে। প্রথম আলো ও ব্র্যাক আয়োজিত এই গোল টেবিল বৈঠকে ‘শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্ব পূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ সহ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় উঠে আসে যে, শিক্ষায় প্রধান সমস্যা হচ্ছে শিখন ঘাটতি। শিখন ঘাটতি মানে শ্রেণিকক্ষে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের শিক্ষা না পাওয়া। প্রাথমিক শেষ করেও বহু শিশু গণিতে মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে না পারা। এর ফলে শিক্ষা থেকে দক্ষতা এবংদক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান ব্যাপারটি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ববী হাজ্জাজ বলেন, ‘আমাদের ফোকাস থাকবে, লার্নিং আউটকাম বেইজড এডুকেশন, ক্যারিয়ার ভিত্তিক এডুকেশন।’ তিনি আরো বলেন ,‘তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষায় ছোট ছোট পরিবর্তন করলে, দীর্ঘমেয়াদে অনেক পরিবর্তন পাওয়া যাবে। ছোট ছোট তিনটি জায়গা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হল—শিক্ষাক্রম, শ্রেণিকক্ষ, ও ধারাবাহিকতা। শিক্ষাক্রম যদি ঠিক হয়, শ্রেণিকক্ষ যদি সঠিক হয় এবং এটি যদি ধারাবাহিকভাবে করা যায়, তাহলে শিক্ষায় অনেক পরিবর্তন হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকে গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। না শিখে বের হলেও এখানে ঝরে পড়ার হার কিন্তু অনেক কম।’ মন্ত্রী মহোদয় বলছেন বটে, ছোট ছোট পরিবর্তন, কিন্তু এই ছোট পরিবর্তনের প্রথমটি শিক্ষাক্রম, এটিই তো পরিবর্তন করতে গিয়ে পূর্ববর্তী সরকার সমূহ হিমশিম খেয়েছেন, শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত থাকার ফলে অভিজ্ঞতায় বুঝেছি যে ভালো হোক বা খারাপ হোক সেটা যাচাই না করেই দেশের কিছু কিছু অভিভাবক নতুন শিক্ষাক্রম দেখেই হৈচৈ শুরু করে দেওয়া এ জাতির মজ্জাগত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রযুক্তির এযুগে আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত একটা শিক্ষাক্রম অবধারিতভাবে প্রয়োজন। তবে আশা করা যায় এবারের সরকার এ বিষয়ে তৎপর হবেন।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার ইতিমধ্যেই মনোযোগী হয়েছে শিক্ষাজগতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। সরকার শিক্ষাজগতের শিরোমণি, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। একজন প্রমাণিত চৌকষ মানুষকেই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। মাননীয় প্রতিমন্ত্রীও শিক্ষাবান্ধব মানুষ। তাই এবারের সরকার শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলা যায়।
ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, ‘সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।’ এরই ধারাবাহিকতায় বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে শিক্ষার উন্নয়নে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবার শিক্ষাবিভাগের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সকলে হয়তো একটু স্বস্তিকর অবস্থায় ফিরবে।
স্বস্তিকর অবস্থায় ফেরার প্রধানতম কারণ হলো বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি। পূর্বকার বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ বাজেটে সমস্ত পরিকল্পনা যে ভেস্তে যায়, তা পূর্ববর্তী সরকারের সমূহের আমলে টের পাওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো উচ্ছৃঙ্খলতা ছাড়া কোনো কিছুরই অগ্রগতি চোখে পড়েনি, এবারের সরকার আদর্শ জিডিপি বরাদ্দ ৬ শতাংশ থেকে ১শতাংশ কম, ৫শতাংশ হলে আর যদি দুর্নীতির লাগাম ধরে রাখা যায়, তবে শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন সম্ভব বলে ধারণা করা যাচ্ছে। নতুন সরকারের নতুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ১৮০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে এমন বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রাথমিক ভাবে দুই লাখের বেশি প্রাইমারী ‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও কেডস বিতরণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সমস্ত প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল–ড্রেস ও কেডস বিতরণ করা হবে ।
সরকার শিক্ষা বিষয়ে তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে গুরুত্বারোপ করে শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতে আধুনিকায়তন ও অন্তর্ভুক্তিমুলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরী শিক্ষা এবং ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি, কর্মসূচী ইত্যাদি বিষয়ে জোর দেন। মন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জট দূর করতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রয়োজনে একাধিক শিফটে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দ্রুত সব শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের কথা বলেন। জাতীয়করণ হওয়া অর্থাৎ বেসরকারি থেকে সরকারি হওয়া ৫০ বছরের উর্ধ্ব বয়সী শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার নির্দেশ দেন। ইতিমধ্যে শিখন ঘাটতি পূরণের জন্য শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় অধিকতর মনোযোগ দেওয়ার প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রণালয় শিক্ষাকার্যক্রমকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যাতে চালু রাখা যায় তার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, তীব্র জানজট ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে অনলাইন ও সশরীর এই মিশ্র পদ্ধতিতে শিক্ষাকার্যক্রম চালু করার কথা ভাবছেন, তবে তিনি এও বলেন যে বৃহৎ স্কুলগুলো, ভালো স্কুলগুলো তাদের এডুকেশনকে সঠিক মাত্রায় পৌঁছাতে এই উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। দুর্বল স্কুলদের জন্য অবশ্য এখনো সঠিক চলমান এই প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা থাকায় এখনো কোনো ষে বিষয়ে নির্দেশনা নাই। তবে শনিবারের ছুটি আপাতত স্থগিত হয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক, কারিগরী সব পর্যায়ে, এর ফলে কিছুটা শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তিনি ধীরে ধীরে এগোবেন। হঠাৎ করে কিছু করবেন না যাতে, শিক্ষাকার্যক্রমে ধস লাগে।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বা কারিগরি শিক্ষা সবক্ষেত্রেই মূলত শিখন ঘাটতি পূরণ, মান সম্মত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ এর দিকে অধিকতর তদারকিকরণে বর্তমান সরকারের দৃষ্টি দেওয়া বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা।
লেখক: প্রাবন্ধিক; সাবেক অধ্যক্ষ, হুলাইন সালেহ নূর কলেজ।













