ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের পাশাপাশি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। ঢাকার থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে প্রায় তিন বছরের অচলাবস্থার অবসান হতে যাচ্ছে। বিমানবন্দরের মালিকানা সরকারের হাতে রেখে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাপানি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ২৫ আগস্ট থার্ড টার্মিনালের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সের জন্য কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে জাপানি সাব–ওয়ার্কিং গ্রুপ। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের গঠিত মূল্যায়ন কমিটি প্রস্তাব দুটি যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কারিগরি প্রস্তাবের পর আর্থিক প্রস্তাব পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় দর কষাকষি শেষে চুক্তি হতে পারে বলে সূত্র আভাস দিয়েছে। থার্ড টার্মিনালের মডেল অনুসরণ করে শাহ আমানত বিমানবন্দরও বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটরের হাতে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। অবশ্য শাহ আমানত বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা এই ধরনের কোনো চিঠিপত্র পাননি বলে জানিয়েছেন।
এদিকে ঢাকার থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি পাঁচটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। এগুলো হলো যুক্তরাজ্যের মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইজপোর্ট, তুরস্কের এলিভি এভিয়েশন হোল্ডিংস, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডিনাটা এবং সিঙ্গাপুরের এসএটিএস। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে থার্ড টার্মিনালে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমানের পাশাপাশি দ্বিতীয় একজন আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের চিন্তাভাবনা চূড়ান্ত করেছে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পুরোটা এককভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পরিচালনা করবে।
সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের (ওঅ্যান্ডএম) জাপানি কনসোর্টিয়ামে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমু কর্পোরেশন, নিপ্পন কো–এই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন রয়েছে। উপরোক্ত চারটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কনসোর্টিয়ামটির নেতৃত্বে রয়েছে জাপানের বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমু কর্পোরেশন। এর সঙ্গে বিমানবন্দর পরিচালনায় বিশেষায়িত অপর তিনটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে।
প্রাথমিক আলোচনায় ১৫ বছরের জন্য থার্ড টার্মিনাল জাপানি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়ার কথাবার্তা হয়েছে। ১৫ বছরের অপারেশন মেয়াদে কনসোর্টিয়াম প্রায় ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ওঅ্যান্ডএম সংক্রান্ত বিনিয়োগ করবে। তারা মোট রাজস্বের ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলাদেশকে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। পরে তারা রাজস্বের ২৭ শতাংশ প্রদানের ব্যাপারেও আলোচনা করে। তবে বাংলাদেশ প্রস্তাবটি চূড়ান্ত না করে আরো আলোচনার প্রস্তাব করেছে।
ঢাকার থার্ড টার্মিনালের ব্যাপারটি চূড়ান্ত হতে কিছুটা সময় লাগবে। এ টার্মিনালে কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হবে। এখানে রাজস্বের যোগানও বিপুল। যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া ফি’র পাশাপাশি উড়োজাহাজ অবতরণ ও উড্ডয়ন সংক্রান্ত চার্জ, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার, যাত্রীসেবা ফি, নিরাপত্তা ও কার্গো সংক্রান্ত চার্জ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ডিউটি ফ্রি দোকান, রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান, পার্কিং, গাড়ি ভাড়া, বিজ্ঞাপন, লাউঞ্জ, অফিস ও বাণিজ্যিক জায়গা ভাড়া এবং অন্যান্য খাত থেকে বিপুল অর্থ আসবে। বেবিচক দেশের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করে নিজেদের হিস্যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক যাত্রীর বিমানবন্দর সার্ভিস ফি বর্তমানে ৫০০ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ যাত্রীর ক্ষেত্রে ৫০ টাকা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গড় ল্যান্ডিং চার্জ প্রায় ২ হাজার ১৫৭ ডলার এবং দেশীয় ফ্লাইটের ল্যান্ডিং চার্জ ৩ হাজার ৩০০ টাকা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের গড় চার্জ প্রায় ১৩৮ ডলার এবং কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে সিকিউরিটি চার্জ প্রায় ৬ সেন্ট। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে বছরে গড়ে এক লাখের বেশি ফ্লাইট চলাচল করে।
থার্ড টার্মিনালে উপরোক্ত আয়ের পাশাপাশি নতুন টার্মিনালের বিশাল কমার্শিয়াল স্পেস, আধুনিক পার্কিং, লাউঞ্জ, ডিউটি ফ্রি শপ, বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য খাত থেকে প্রচুর রাজস্ব আয়ের সুযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় অপারেটর নিয়োগের সময় ‘মোট রাজস্ব’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, কোন কোন আয় ভাগাভাগির আওতায় থাকবে এবং কোন আয় সিএএবি নিজস্ব রাজস্ব হিসেবে থাকবে, এসব শর্ত সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, থার্ড টার্মিনালের নির্মাণে মোট ব্যয় হয় প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। জাপানের জাইকা এই প্রকল্পে ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার যোগান দিয়েছে। এই ঋণের সুদ ১ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং গ্রেস পিরিয়ডের পর ২০ বছরে ঋণ শোধ করার কথা রয়েছে। ঢাকা বিমানবন্দরের বর্তমান চালু দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত যাত্রী হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে তিনটি টার্মিনালের যাত্রী হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীতে উন্নীত করা হবে। জাইকার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আগামী বছরের মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে, যার মধ্যে ১ কোটি ৩৫ লাখের বেশি ইন্টারন্যাশনাল প্যাসেঞ্জার।
থার্ড টার্মিনালের ভবনের আয়তন প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার বর্গমিটার। এতে ১১৫টি চেকইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপার্চার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ১২টি বোর্ডিং ব্রিজ, ১২টি ব্যাগেজ কনভেয়র এবং আধুনিক পার্কিং ও অন্যান্য সুবিধা রয়েছে।
শাহজালালের টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের পাশাপাশি চট্টগ্রামের শাহ আমানতের টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ করা হলে বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে সরকারের নীতিনির্ধারণে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, টার্মিনালটির যাত্রীসেবাসহ আনুষাঙ্গিক খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার শাহ আমানত বিমানবন্দরকে বেসরকারি অপারেটর দিয়ে পরিচালনার চিন্তাভাবনা করছে। এই বিমানবন্দরের সাথে শুধু বিমান পরিচালনা বা যাত্রী হ্যান্ডলিং নয়, এর সাথে চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগেরও সম্পর্ক রয়েছে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, এই ধরনের কোনো আলোচনা বা চিঠিপত্র এখনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আসেনি।












