বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তৃণমূল থেকে উঠে এসে বিএনপির দুর্দিনের কাণ্ডারী হয়ে ওঠা এ সজ্জন রাজনীতিক এবার আসীন হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেন তিনি; শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীসহ কয়েকশ অতিথি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এ শপথের মধ্য দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আগামীকাল রোববার তিনি বঙ্গভবনে উঠবেন বলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে। সেদিন সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে তিনি মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবন থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওয়ানা করবেন। খবর বিডিনিউজের।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান পেল বঙ্গভবন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পরে হওয়া এ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ভোট পান ২৫৫টি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের বাক্সে পড়ে ৮৮ ভোট।
শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দরবার হলে প্রবেশ করেন তিনি। দরবার হলের মঞ্চে তিনটি আসন ছিল। মাঝের আসনে বসেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তার ডানে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; ডানে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। তারাসহ অনুষ্ঠানের অতিথিরা নিজেদের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালে ব্যান্ডদলের সদস্যরা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় সংগীত বাজান। এরপর আসন গ্রহণ ও শপথ অনুষ্ঠান শুরুর অনুমতি প্রার্থনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব শপথবাক্য পাঠ করানোর জন্য অনুরোধ জানান। তখন রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার। শপথ পাঠ শেষ হলে শপথনামায় সই করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথনামা সত্যায়িত করেন স্পিকার। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ফুল দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান এবং নিজেদের আসন পরিবর্তন করে বসেন।
রাষ্ট্রপতির শপথ শেষ শপথ নেন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী। তাদের শপথ শেষে রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সেই সঙ্গে অতিথিদের দরবার হলের উত্তর দিকে ক্রেডেনশিয়াল মাঠে চা–চক্রে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।
শপথ অনুষ্ঠানে দরবার হলের প্রথম সারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিনী সৈয়দা শামিলা রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান।
নতুন রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা, ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ, বড় মেয়ের স্বামী ফাহাম আব্দুস সালাম, মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ও মির্জা ইকবাল আমিনও এসেছিলেন বঙ্গভবনে।
প্রথম সারিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সংসদের বিরোধী দলীয় দলের নেতা শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকেও দেখা গেছে।
অতিথিদের সারিতে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার–উজ–জামান, বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহলসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ছিলেন অতিথিদের কাতারে।
বঙ্গভবনে উঠবেন রোববার : নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন বলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে। সেখানে বলা হয়, রোববার বঙ্গভবনে ২ নম্বর গেইটে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ মঞ্চে নিয়ে যাবে। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেবে। এ পর্ব শেষে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে তার কার্যালয়ে যাবেন।
রাষ্ট্রপতি কার্যালয় জানিয়েছে, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন নতুন রাষ্ট্রপতি। সেখানে পুস্পস্তবক অর্পণ করার পর তাকে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানোর পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিন্টু রোডের বাসায় ফিরবেন। এরপর তিনি তার গুলশানের বাসভবনে যেতে পারেন।
নতুন রাষ্ট্রপতিকে বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন : বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, চীন ও নেপালের নেতারা। অভিনন্দন বার্তায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সমপ্রসারণ এবং নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বলেছেন, দুই দেশের অংশীদারত্ব আরও জোরদারে তিনি মির্জা ফখরুলের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছেন। গতকাল রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় দ্রৌপদী মুর্মু বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি সফল পর্বের সূচনা হবে বলে তাঁর বিশ্বাস। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে রয়েছে অভিন্ন আত্মত্যাগের ইতিহাস, ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের উষ্ণ বন্ধন। সামপ্রতিক সময়ে জ্বালানি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, যুব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশার কথা জানিয়ে মুর্মু মির্জা ফখরুলের সুস্বাস্থ্য, মঙ্গল ও দায়িত্ব পালনে সফলতা কামনা করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের অব্যাহত উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন তিনি।
এদিকে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় শপথ অনুষ্ঠানের আগে ঢাকায় পাকিস্তান হাই কমিশন এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও জনগণের কল্যাণ অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন জারদারি। তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামপ্রতিক ইতিবাচক গতিশীলতাকে স্বাগত জানিয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং জনগণের মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতা বাড়াতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে পাকিস্তান সফরের জন্য বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। জারদারির মতে, এ সফর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
অন্যদিকে, চীনও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে। গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় এবং দুই দেশের নেতাদের মধ্যে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিময় ও সহযোগিতা সমপ্রসারণ এবং নতুন যুগে চীন–বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সমপ্রদায় গঠনে নতুন অগ্রগতি অর্জনে কাজ করবে বেইজিং।
নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নেপালের রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেলও। শুক্রবার এক অভিনন্দন বার্তায় তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নতুন দায়িত্বে সফলতা কামনা করেন। নেপাল ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে পৌডেল দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক ও পারস্পরিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক বন্ধন ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ভিত্তিতে নেপাল ও বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।












