সাহিত্য খুব সহজ কিছু নয়। মেধা, প্রতিভা, চর্চা এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহ থাকলে হওয়া যায় লেখক কবি, হয়তোবা। তবে, দরকার হয় কঠিন তপস্যা। একটা সমাজের সবাই লেখক হতে পারে না। লেখকের থাকে তৃতীয় চোখ, উপলব্ধির যথার্থ জায়গা এবং সংবেদনশীল তীক্ষ্ণ দহন ও অনুভূতিময় সংরাগ। আর পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে নিবেদিত, প্রজ্ঞাবোধের অনন্য যাপন। সাহিত্যকে সমাজের আয়না মনে করা হয়। একজন সাহিত্যিক, কবি গভীর প্রজ্ঞা দিয়ে সমাজ– রাষ্ট্রকে বিচার বিশ্লেষণ করেন। সবাই যেহেতু লেখেন আমাকেও লেখতে হবে, ব্যাপারটাও এতটা সরল সহজ নয়। রাষ্ট্রের সব নাগরিকের লেখার অধিকার আছে। তবে লেখার পূর্বে গভীর পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন বেশি বেশি প্রয়োজন। সমকালীন বিষয় অনুষঙ্গ ধরে ও মেনে লেখতে আসা দরকার। একবিংশ শতাব্দীতে বাস করে, আঠারো কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখকের মতো পুরনো ভাষা ও বিষয় পদ্ধতিতে লেখলে যিনি লিখবেন তার আইডেন্টিটি বা অস্তিত্বের সংকট হতে পারে, তাঁকে সনাক্ত করা মুশকিল হবে। অষ্টাদশ শতকের জগদ্বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক ফ্রঁসোয়া মারি আরুয়ে ছদ্মনামে যিনি ভলতেয়ার নামে পরিচিত ছিলেন সারাবিশ্বে, স্বাধীন মতামতের পক্ষে এবং ধর্ম ও মানুষের পক্ষে যার জোরালো দার্শনিকতা সেই সময়ে ফ্রান্সের সেন্সর আইন অমান্যকারীদের একজন সাংস্কৃতিক উচ্চকিত কণ্ঠ, লেখালেখি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যে লেখক ভাববে লেখালেখিতে নতুন কিছু দেবার ক্ষমতা ফুরিয়ে গেছে, অন্য বিকল্প না ভেবে তাঁর লেখালেখি ছেড়ে দেওয়া উচিত। লেখকের মহত্তম কর্ম নিজের সময় ও যুগকে নবায়ন করা নতুন চিন্তায় ও দার্শনিকতায়।
আমাদের শহরে সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের কমতি নেই। যারা বা যে সংগঠন সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তাঁদের সর্বাংশে সতর্ক থাকা দরকার। মঞ্চে গড়পড়তা সবাইকে বসিয়ে কবিতা পড়িয়ে নেবার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। হরেদরে সবাইকে পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ থেকে মুক্তি দিতে হবে সংগঠনকে। এমনও দেখতে হয়েছে বছর দেড়েক লিখে মঞ্চে উঠে লেখার জন্য পুরস্কার পাচ্ছে বা ক্রেস্ট নিচ্ছে বেজায় খুশি মনে। এতে দুপক্ষেরই ক্ষতি। সংগঠক ও নির্বাচকমণ্ডলীর দুর্বলতা চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। পুরস্কারপ্রাপ্তজন ভাবে দুনিয়াতে লেখা ও পুরস্কার অর্জন খুবই সহজ কাজ। সে–ই সর্বোত্তম লেখক যেহেতু সে পুরস্কৃত। তৎপরবর্তী দম্ভের কারণে লেখাজোকা আর হয়ে ওঠেনা। রাতদিন কত পরিশ্রম করে, কত বইপত্র পড়ে, চিন্তার জগৎ কর্ষণ করে একেকজন লেখক কবি তৈরি হতে থাকে। যুগের পর যুগ চলে যায় পুরস্কার হাতে ওঠে না। কবি জীবনানন্দ দাশ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। মানিক বন্দোপাধ্যায়, অভাব অনটনের দিন কাটিয়েছেন, সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ আরও অনেক স্বনামধন্য ধীমান লেখক কবিরা পুরস্কৃত হননি। পাশ্চাত্যে এ সংকট আরও প্রবল প্রতীয়মান হয়। দ্যা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং, উপন্যাসের বিশ্বখ্যাত চেক ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক মিলান কুন্দেরা। কয়েকবার নোবেল শর্টলিস্টে নাম থেকেও শেষ পর্যন্ত নোবেল পাননি। সে রকম আরও কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত লেখক জেমস জয়েস, ফ্লানৎস কাফকা, লাতিন আমেরিকার জাদুকরী বাস্তববাদী লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে নোবেল পাওয়ার যোগ্য মনে করা হলেও শেষ অব্দি নোবেল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এভাবেই হারুকি মুরাকামি, আন্তম চেখভ, জর্জ অরওয়েল, এনিম্যাল ফার্ম এর মতো জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস লেখে নোবেল জুটেনি। লেখালেখি কঠিন সাধনা ও নিয়মিত চর্চার বিষয়। এ জন্য নতুন সংগঠনগুলোর প্রয়োজন প্রত্যেক মাসে অন্তত একটা করে সাহিত্য সভার আয়োজন করা। এবং সে সভাতে পঠিত লেখার ওপর আলোকপাত করা। ভুল শুদ্ধ ধরিয়ে দিয়ে লেখক কবিকে প্রশিক্ষিত করে তোলা। বিশেষ করে লেখনশৈলী ও ছন্দ বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করা।
সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠনগুলোকে সুদূরপ্রসারি চিন্তাভাবনা করতে হবে। যেমন এক; সাহিত্য সংস্কৃতিতে স্থানীয় চিরায়ত একটা বিষয় থাকে। লোক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে লোকায়ত জীবন দর্শন আচার অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে দিয়ে। সেখানেই থাকে একটা সমাজের অস্তিত্বের চেহারা। অথচ ভীষণ ভয়ঙ্করভাবে সংকোচিত হয়ে আসছে লোক জীবনের বিবিধ অনুষঙ্গ। আজকাল যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, বাউলগান, পালাগান, গ্রামীণ বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নেই বললেই চলে – সে বিষয় কাজ করার ক্ষেত্র সমপ্রসারিত করা বিবিধ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিংবা পাল্টে যাওয়া সময় বিবেচনায় হুবহু করা না গেলেও বিকল্পধারার চিন্তা করা। দুই: স্টাডি সার্কেল আয়োজন করা। যেখানে নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হবে। এখনকার সময়ে উত্তর– ঔপনিবেশিক সমাজ রাষ্ট্র, সাহিত্য নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে সারা বিশ্বব্যাপী। নিম্নবর্গীয় মানুষের সাহিত্য ও অধিকারবোধ নিয়ে কেউই কথা বলেনা –সে বিষয় নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া দরকার। তিন: গত শতাব্দীর নব্বুইয়ের দশকে উত্তর আধুনিক দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে সব জায়গায় তাত্ত্বিক আলোচনা হচ্ছে – সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। চার: সাহিত্যে নৃতাত্ত্বিক আদিবাসী সংখ্যালঘুদের সাহিত্য অধিকারবোধ নিয়ে আমরা কম বেশি চুপচাপ থাকি – সে বিষয়ে রাষ্ট্র কাঠামোর পরিধিতে বিস্তৃত খোলামেলা আলোচনা দরকার।
পাঁচ : আমাদের লোকমানস চেতনা যাঁরা উর্বর করে গেছেন এদেশের মাটি নিংড়ানো সাহিত্য গান, রসের ধারা, তাঁরা আজ উপেক্ষিত। হাছন রাজা, লালন শাহ, শাহ আব্দুল করিম, গগনহরকরা, নবীনচন্দ্র সেন, যাত্রামোহন সেন, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা, নিয়ে নতুন কোনো আবিষ্কার নেই। সাহিত্য–সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নতুন চিন্তার উদ্রেক করতে পারে। ছয়: বগুড়ার মহাস্থানগড় বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে বড় একটা ইতিহাসের জায়গা। কুষ্টিয়ায় লালন আখড়া লেখক সাংস্কৃতিকজনদের অভিজ্ঞতা অর্জনের জায়গা। ধর্ম–বর্ণ ভেদে একটি বড় মানবিক স্থান লালনের ছেউড়িয়া অঞ্চল। সংগঠনগুলো যদি প্রতি বছরের শেষে অন্তত দু‘জন লেখক প্রতিনিধি পাঠিয়ে সে–সব ঐতিহাসিক বাস্তব বিষয়ে সম্যকরূপে জ্ঞান অর্জন করে পরবর্তী পর্যায়ে লেখাজোকা নিবেদিত থাকে, সে–ই লেখা সমৃদ্ধ হবে নিঃসন্দেহে। সাত: আমরা কেন ভুলে যাই বছরের পর বছর জুড়ে পাহাড়ের গহিনে অস্থায়ী বসবাস করে উপমহাদেশর বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতাদেবী আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম লিখেছেন– অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু। সেলিনা হোসেন এর আদিবাসীদের গল্প। এ–সব বলতে গেলে অনেক তালিকা চলে আসবে। আট: এসমস্ত বিষয়কে ধারণ ও বহন করার জন্য দরকার সংঠনের নিয়মিত মুখপত্র। সংঠনের সাথে সম্পৃক্ত সাহিত্য জনেরা বছরে একটা কিংবা দুটি মুখপত্র প্রকাশ করে চুপচাপ বসে থাকে। তা–ও ক্লিশে অপরিপক্ক সূচি নিয়ে প্রকাশিত ম্যাগাজিন। প্রয়োজনীয় স্টেজ অনুষ্ঠান ব্যতীত অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান কাটছাঁট করে যদি সংগঠনের মুখপত্র কিংবা ম্যাগাজিন প্রকাশে মনোনিবেশ করলে সংগঠের অন্যান্য সভ্যরা সচেতন হবে লেখাপড়ায়। গত ৪ দশক পূর্বেও তখনকার তরুণদের মধ্যে লিটলম্যাগ, ছোট পত্রিকা কিংবা নিছক সাহিত্য পত্রিকার বের করার প্রতিযোগিতা ছিলো। সাহিত্যের নিরীক্ষাধর্মী কাজ কে কতভাবে কত বিষয় নিয়ে করতে পারে সে নিয়ে সুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে পারে। যে–সব সোনালি দিনের ইতি ঘটেছে ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগ্রাসনের ফলে। এ–সব বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন আছে। ফেসবুকে আসক্তি, লেখাজোকার অবারিত অসম্পাদিত সুযোগে লেখক বেড়েছে অগুনতি। প্রতি সপ্তাহান্তে ফেসবুক নতুন নতুন লেখকের জন্ম হচ্ছে। এঁদের মধ্যে এ আইয়ের আগ্রাসন চলছে। এ আই কবিতা গদ্য প্রবন্ধ আলোচনা এক বোতামের টিপে বের করে দিচ্ছে। ফলে, বই পড়ার যে তাগাদা চল্লিশ বছর পূর্বে ছিলো সেটি অবশিষ্ট নাই। লেখকদের চিন্তার ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সব কিছু তৈরী পেলে কে আর কষ্ট করতে চায়! এখনকার লেখকদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ক্রমশ তলানিতে। সামাজিক, রাষ্ট্রীক ও মেধার অবক্ষয় বিখণ্ডায়নে একটা জলজ পচনশীল পানার মতো। অর্থের বিনিময়ে স্বীকৃতি লাভ করছে খুব সহজেই। সংগঠনগুলোও হাঁটছে পুরনো পদ্ধতিতে। কোন গুণসম্পন্ন ভাবসমৃদ্ধ মুখপত্র নেই, কিন্তু জাঁকজমকপূর্ণ স্টেজ অনুষ্ঠান চাই। দশ বিশ বছর পরে এ–সব অনুষ্ঠানের কথা খুব একটা আলোচিত হবে না আগামী প্রজন্মধারায়। যদি পত্রিকা বা ম্যাগাজিন থাকে হাতে সেটি নিয়ে আলোচনা হবে। কোন সংগঠন কী কী সিরিয়াস কাজ করেছে, নাকি দায়সারাভাবে কাজ সেরেছে তার মূল্যায়ন আগামী প্রজন্মের হিসেবে চলে যাবে। যদি গুণগত উৎকর্ষতা থাকে রুচি ও সূচিতে পত্রিকায় মূল্যায়ন হবে ভিন্ন ও ইতিবাচক। অগ্রসর সাহিত্য সমাজ দর্শন এভাবেই গঠিত হতে থাকে। মানসম্পন্ন কাজ করেছে যাঁরা এমন কেউ বেঁচে থাকলে নিজেদের কাজের জন্য আত্মতুষ্টি লাভ করবে। যাঁদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল কাজ তাঁরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা টের পাবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।










