দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে দেখা দেয়া নৈরাজ্য ঠেকিয়ে লাইটারেজ জাহাজ চলাচলে শৃঙ্খলা এবং ব্যবস্থাপনাকে আরো গতিশীল করতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আজ চট্টগ্রামে উচ্চ পর্যায়ের সভা ডেকেছেন। সভায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাহাজ মালিকদের তিনটি সংগঠনের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অংশীজনদের নিয়ে অনুষ্ঠাতব্য এই সভায় লাইটারেজ জাহাজ ম্যানেজমেন্টকে আরো গতিশীল ও শৃঙ্খলায় আনার অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র বলেছে, দেশের আমদানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্ল্যাগ, স্টিল, এইচআর কয়েল, সয়াবিন ভূষি, কোপ্রা, উডপাল্পসহ নানা ধরনের পণ্যবাহী বড় জাহাজ প্রতিদিনই বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। ড্রাফটজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে এসব মাদার ভ্যাসেলের অধিকাংশই জেটিতে ভিড়তে পারে না। ফলে বহির্নোঙরেই গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে ছোট লাইটারেজ জাহাজে তোলা হয়। এরপর অভ্যন্তরীণ নৌপথে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয় আমদানিকৃত এসব পণ্য।
এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন করা হয়। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একযোগে দুই তিনটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা থাকে। পরে কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টিরও বেশি গন্তব্যে এসব পণ্য পৌঁছানো হয়।
কিন্তু দেশের আমদানি বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবহন ব্যবস্থা এখন নানা অভিযোগ, বৈষম্য ও অনিয়মের মুখে পড়েছে। সাধারণ জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকদের অভিযোগ, লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল বা বিডব্লিউটিসিসির চালু করা সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ না করে কয়েকশ’ লাইটারেজ জাহাজ ইচ্ছেমাফিক চলাচল করছে।
অভিযোগ করা হয়েছে যে, ৪০০টিরও বেশি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ না করেই পণ্য পরিবহন করছে। আবার অনেকেই সিরিয়ালের অপেক্ষায় অলস বসে থাকে। ফলে একই খাতে দুই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। সিরিয়াল মেনে জাহাজ নিতে গিয়ে সাধারণ আমদানিকারকদের যেখানে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ৬০০ টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে, সেখানে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ ব্যবহার করে অন্যরা একই পণ্য প্রায় ৪০০ টাকা টনপ্রতি ভাড়ায় পরিবহন করতে পারছে। আবার বড় বড় শিল্পগ্রুপ ও আমদানিকারকরা নিজেদের মালিকানাধীন জাহাজ ব্যবহার করে আরও কম খরচে পণ্য পরিবহন করছে।
এতে লাইটারেজ পরিবহন খাতে তীব্র অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অপেক্ষাকৃত ছোট আমদানিকারক ও সাধারণ জাহাজ মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধীরে ধীরে বাজার থেকে ছিটকে পড়বেন।
জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকেরা বলেছেন, পুরো সেক্টরটিতে এক ভয়াবহ রকমের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। একদিকে শত শত জাহাজ মাসে গড়ে একটি ট্রিপও পাচ্ছে না। অপরদিকে সিরিয়ালবিহীন জাহাজগুলো মাসে একাধিক ট্রিপ ভাড়া পাচ্ছে। এতে সিরিয়াল অনুসরণ করা জাহাজ মালিকেরা জাহাজে কর্মরত নাবিকদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, অপরদিকে যারা সিরিয়াল মানছেন না তাদের জাহাজগুলো লাখ লাখ টাকা আয় করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আইন কিংবা কোনো সিস্টেম থাকলে সেটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমানে শিল্পগ্রুপ, বড় আমদানিকারক ও প্রভাবশালী জাহাজ মালিকদের ক্ষেত্রে এক ধরনের ব্যবস্থা এবং সাধারণ জাহাজ মালিকদের ক্ষেত্রে আরেক ধরনের ব্যবস্থা চলছে। এটি ছোট মালিকদের বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া বলেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিরিয়ালের বাইরে জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বিডব্লিউটিসিসিও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। প্রতিদিন নিয়মিত বার্থিং মিটিং আয়োজন এবং আমদানিকারকদের চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ সরবরাহেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তর চট্টগ্রামে উচ্চ পর্যায়ের এক সভা আহ্বান করে পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারীর সভাপতিত্বে আজ সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠাতব্য সভায় বিডব্লিউটিসিসির অংশীজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে সকলের সাথে আলাপ আলোচনা করে লাইটারেজ জাহাজ ম্যানেজমেন্টকে আরো গতিশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের প্রতিনিধি, নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপ্যাল অফিসার, বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, কোস্টাল শীপ ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।










