রোহিঙ্গা গান ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান:

সাদৃশ্য, প্রভাব ও পারস্পরিক সম্পর্ক

নাসির উদ্দিন হায়দার | শুক্রবার , ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান এবং রোহিঙ্গা গান–দুটি দুই দেশের পৃথক লোকসংগীতধারা হলেও ভৌগোলিক নৈকট্য, ভাষিক যোগাযোগ, অভিন্ন উপকূলীয় পরিবেশ, ঐতিহাসিক যাতায়াত এবং মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মেলামেশার কারণে এ দুই ধারার মধ্যে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম ও আরাকান অঞ্চলের মধ্যবর্তী নাফ নদী রাজনৈতিক সীমারেখা তৈরি করলেও লোকসংস্কৃতির প্রবাহকে কখনো পুরোপুরি আটকে রাখতে পারেনি।

প্রসঙ্গত, আরকান ও চট্টগ্রামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদীর্ঘকালের। একটা সময় চট্টগ্রাম আরকান রাজ্যের অংশ ছিল। আরকান রাজসভায় রচিত হয়েছে অমূল্য বাংলা সাহিত্য। আরকানের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হয়েছে অসংখ্য গান…

ও শাম রেঙ্গুম ন যাইও রে

কনে খাইব রেঙ্গুমর কামাই রে শাম।

রেঙ্গুমের রেশমী শাড়ি

ন পিন্দিয়ম মুই অবলা নারী রে শাম।

(কথা ও সুর : আবদুল গফুর হালী, শিল্পী : শেফালী ঘোষ)

২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ায় রোহিঙ্গা সংগীতের একটি নতুন পর্যায় তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফ অঞ্চলে তারা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগে এসেছে। চা–দোকান, বাজার, আশ্রয়শিবির ও সামাজিক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার অঞ্চলের ভাষা ও গান তাদের সংগীতচর্চার সঙ্গে মিশেছে। রোহিঙ্গা শিল্পীরা নতুন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন গান ও সুরও তৈরি করছেন। আবার কক্সবাজারের স্থানীয় শিল্পীরাও রোহিঙ্গাদের ‘তারানা’ সংগীতে আপ্লুত। কক্সবাজার তথা বাংলাদেশের অনেক শিল্পী রোহিঙ্গা গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন।

তবে ‘রোহিঙ্গা গান’ এবং ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান’কে একে অপরের উৎস বা অনুকরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং দুই ধারার সম্পর্ককে সীমান্তবর্তী দুই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ফল হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। বিশেষ করে ভাষা, প্রেম–বিরহ, নদী–সমুদ্র, ঘরছাড়া মানুষের বেদনা, ধর্মীয় অনুভূতি ও স্বদেশস্মৃতির ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে লক্ষণীয় মিল রয়েছে। দুই ধারার গানের কথা, সুর ও গায়কী প্রায় কাছাকাছি।

সামপ্রতিক সময়ে কক্সবাজার তো বটেই গোটা বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে নিচের রোহিঙ্গা গানটি

ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বইয়ার আনের খোশবু তোঁয়ার

দিলে ডাকের লে তোঁয়ারে ও পোয়াইজ্জা।।

আহ! কি মধুর ভাষা, ভালোবাসা! চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় পোয়াইজ্জা মানে হচ্ছে সমবয়সী সঙ্গী, সমবয়সী বন্ধু। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, সেই বাতাস বন্ধুর খুশবো বয়ে আনছে। মনেপ্রাণ চাইছে বন্ধুর সঙ্গ।

বাড়ির জাউল হাসের ফুলর কলি নাচের

ইন দেইলে ওদ্দা আঁর মনত খুশি নো আইয়ের

দূরে যাইলে কই যা, আঁরে তোঁয়ার ঠিকানা

দিলে ডাকের লে তোঁয়ারে ও পোয়াইজ্জা।।

বাড়ির চারপাশের প্রকৃতি হাসছে, ফুলের কলি নাচছে, কিন্তু এসব দেখেও আমার মনে খুশি নেই। বন্ধু তুমি যদি দূরে চলে যাও, তাহলে তোমার ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে যেও।

ভাষা ও উচ্চারণের সাদৃশ্য

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও রোহিঙ্গা ভাষা একই বৃহত্তর ইন্দো–আর্য ভাষিক পরিসরের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। দুই ভাষার মধ্যে উচ্চারণ, ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বহু শব্দে সাদৃশ্য রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা গান চট্টগ্রামের শ্রোতার কাছে অনেক সময় তুলনামূলকভাবে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। (Hoque Muhammad Azizul Chittagonian Variety Dialect Language of Semi Language? IIUC Studies Vol. ১২, ২০১৫/১৬).

রোহিঙ্গা গানের একটি পঙ্‌ক্তি–

‘আঁরা হইলাম পরবাসী’।

অর্থাৎ-‘আমরা পরবাসী হয়ে গেছি।’ এখানে ‘হইলাম’ ধরনের ক্রিয়ারূপ চট্টগ্রামের কথ্যভাষার সঙ্গে অত্যন্ত পরিচিত।

একইভাবে রোহিঙ্গা গানে পাওয়া যায়-‘বাংলাদেশত হিজরত গইল্যাম’। অর্থ-‘বাংলাদেশে হিজরত করলাম।’

‘করলাম’, ‘হইলাম’, ‘ফেলি’, ‘ঘর’ ইত্যাদি শব্দ ও ক্রিয়ারূপ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কথ্যভাষার শ্রোতার কাছে অপরিচিত নয়। তবে ভাষাগত সাদৃশ্যকে সরাসরি এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় গানের ধার নেওয়ার প্রমাণ বলা যাবে না। বরং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও অভিন্ন ভাষিক পরিবেশের ফল হিসেবেই বিষয়টি দেখা উচিত। Farzana Kazi Fahamida Music and Aristic Artefacts Symbols of Rohingya Identity and Everyday Resistance in Borderlands ASEAS, ২০১১.)

চট্টগ্রামে ‘রোঁয়াই’ ও ‘চাডিগ্রাই’ বলে একটা কথা আছে। কারণ সুদীর্ঘকাল আগে রোহিঙ্গারা চট্টগ্রামে বসতি গড়েছে। রোহিঙ্গাদের বাস প্রধানত পাহাড়ি এলাকায়। দুই সমপ্রদায়ই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন, তবে রোঁয়াইদের ভাষা কিছুটা আলাদা। যেমন চট্টগ্রামী বা চাডিগ্রাই যারা তারা মাকে বলে মা, আম্মা। কিন্তু রোঁয়াই বলে ‘মম্মা’। দা কে চাডিগ্রাই বলে দা, কিন্তু রোঁয়াই বলে ‘দ’। আমাদের অর্থে চাডিগ্রাই বলে ‘আঁরও’, রোঁয়াই বলে ‘আঁত্তুন’। যেমন চাডিগ্রাই বলে-‘আঁরওত আজিয়া গরবা আইব’। রোঁয়াই বলে-‘আঁত্তুন আইজ্যা গরবা আইব।’

প্রেম–বিচ্ছেদে স্বদেশ হারানোর কষ্ট

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রেম ও বিরহ। নদী, সাম্পান, মাঝি, ঘাট ও দূরযাত্রা এখানে প্রেম ও বিচ্ছেদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যেমন

“ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে,

অভাগিনীর দুঃখর কথা কই বন্ধুরে।”

(কথা ও সুর : সঞ্জিত আচার্য্য, শিল্পী : কান্তা নন্দী)

এই গানে কর্ণফুলী নদী শুধু ভৌগোলিক নদী নয়; প্রেম–বিরহের সাক্ষী। অন্যদিকে রোহিঙ্গা গানেও বিচ্ছেদ একটি প্রধান আবেগ। তবে সেখানে ব্যক্তিগত প্রেমের পাশাপাশি হারানো দেশ, ঘর ও স্বজনের বিচ্ছেদ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রোহিঙ্গা তারানায় ‘বাড়িঘর’, ‘আরাকান’, ‘পরবাসী’ ইত্যাদি শব্দের পুনরাবৃত্তি তাদের সামষ্টিক বেদনার প্রকাশ ঘটায়।

অর্থাৎ চট্টগ্রামের গানে যে ‘বিরহ’ ব্যক্তিগত প্রেম থেকে শুরু হয়, রোহিঙ্গা গানে তা অনেক ক্ষেত্রে সমপ্রদায় ও স্বদেশ হারানোর সামষ্টিক বেদনায় পরিণত হয়েছে।

এ রোয়াইঙ্গা রে আর ন কাঁদাইও

চোগর ভিতরে আর পানি নাই

বিষ হাবাইয়া মারি ফেল

দুইন্যাত বাচি থাকি লাভ ত নাই।।

(ইউটিউব থেকে সংগৃহীত)

প্রায় ১০ বছর ধরে রোহিঙ্গারা বাস্তুহারা, আছেন বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে। কিন্তু এখনো তাদের মনে দেশে ফেলার আকুতি, আরকান শহরে গিয়ে মনের আশা পুরানোর আশা

একদিন আরকান শঅরত যাইয়ুম,

মনের আশা পুরাইয়ুম

এই আশায় বাঁচি আছি আঁরা

কেন গরি বাইচ্যুম আরকান ছাড়া।।

সামপ্রতিক সময়ে দারুণ জনপ্রিয় হওয়া একটি নিটোল প্রেমের রোহিঙ্গা গান

আইজ্জা এক্কান কাম অইয়ে

পুছার গরঅনা কি অইয়ে

মেহবুবাইয়ে আইজ্জা আঁরে

তারও ঘরত মাতাইয়ে।।

রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গান

বর্তমান সময়ে রোহিঙ্গা গানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রত্যক্ষ প্রভাবের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় শাহীন আবরারের ‘ও আরাকান’ গানে। গানটি রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে রচিত।

“ও আরাকান, হান্দে যে দিলহান,

হতদিন তোঁয়ার ন দেখি মুখহান।

আঁর ঘরবাড়ি লই বুকত, আছস নি রে সুখত

পেট পুরেদ্দে একবার চাইবল্লাই।।”

এই ভাষা একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ও চাটগাঁইয়া শ্রোতার কাছে বোধগম্য। এখানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা কোনো বাইরের ভাষা হিসেবে রোহিঙ্গা গানে প্রবেশ করেনি; বরং দুই ভাষিক ঐতিহ্য মিলেমিশে একটি সীমান্ত–লোকভাষার সাংস্কৃতিক রূপ সৃষ্টি করেছে। (বাংলাদেশি শিল্পীর ‘ও আরাকান’ যেভাবে রোহিঙ্গাদের প্রাণের গান হয়ে উঠল’, আবদুল কুদ্দুস, প্রথম আলো, ২০২৬।)

এই গানটির জনপ্রিয়তা দেখায় যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা রোহিঙ্গা সংগীতের প্রকাশভঙ্গিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

রোহিঙ্গা গান ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, দুটি ধারার মধ্যে ভাষা, আবেগ, ভূগোল ও লোকজ জীবনচেতনায় গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। চট্টগ্রামের গানে কর্ণফুলী, সাম্পান ও মাঝি যেমন প্রেম–বিরহের প্রতীক, রোহিঙ্গা গানে আরাকান, পাহাড় ও ঘর মানুষের স্বদেশচ্যুতি ও স্মৃতির প্রতীক।

লেখক : সাংবাদিক ও লোকসংগীত গবেষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা
পরবর্তী নিবন্ধদেহাতীত প্রেমে ভাস্বর ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা