কমলাপুর রেলস্টেশন। স্টেশনের এক কোণে বসে আছে রাতুল আর তার বাবা। হাতে দুটো ব্যাগ। ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছে তারা। ট্রেন আসবে কিছুক্ষণ পর।
চারপাশে মানুষের ভিড়–সবাই বাড়ি ফিরছে। স্টেশনজুড়ে তাড়া, ব্যস্ততা আর ঈদের আমেজ। কিন্তু এই কোলাহলে রাতুলের মনটা কেমন যেন চুপচাপ। সে ভাবছে, কখন আবার দেখা হবে প্রিয় বন্ধু রাফির সঙ্গে।
হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। লোহার চাকার গর্জনে কেঁপে উঠল পুরো স্টেশন।
গভীর রাত। কিছু মানুষ ঘুমিয়ে আছে প্ল্যাটফর্মে। বাতিগুলোর অনেকগুলো নিভে গেছে। অন্ধকারে মোড়া প্ল্যাটফর্মে নিঃশব্দ এক ক্লান্তি।
ভোর হতে না হতেই পাখির ডাক শোনা গেল। মিষ্টি এক সকাল। এমন মায়াময় সকাল যেন বহুদিন দেখেনি রাতুল।
ট্রেন থেকে নেমে রাতুলের বাবা ব্যাগ নামালেন।
– “বাবা, খিদে লাগছে খুব। পেটের ভেতর চুই চুই করছে।”
বাবা এক হোটেলে নিয়ে গেলেন। অর্ডার করলেন পরোটা, ডিম আর চা। রাতুল যেন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো খেয়ে নিল। তারপর রিকশা নিয়ে তারা বাড়ির পথে রওনা দিল।
পূর্ব আকাশে সূর্য উঠছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ উঁকি দিচ্ছে। পাখিরা কিচিরমিচির করছে। পুকুরের ঢেউ দোল খাচ্ছে। সবকিছু যেন অপেক্ষায়–রাতুল এসেছে!
বন্ধুরাও এসে গেছে। রাফি তো এসে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল রাতুলকে। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
– “তোকে ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না!”
রাতুল এখন অনেক আনন্দে আছে। গ্রামে ঈদের আমেজ, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা্তসব মিলিয়ে স্বপ্নের মতো কাটছে সময়।
রাতুল ক্লাসে সেরা ছাত্র। বার্ষিক পরীক্ষায় সে ফার্স্ট। রাফি ছিল দ্বিতীয়।
রাতুল বলে,
– “রাফি, আমি জানি তুই অনেক মেধাবী। শুধু একটু মনোযোগ দিলেই তুই ফার্স্ট হতে পারিস। তুই তো সবসময় চিন্তায় থাকিস।”
রাফি হেসে বলল,
– “তুই ফার্স্ট হলে আমি খুশি থাকি, বোকা ছেলে!”
এমন সময় রাতুলের বাবা এলেন।
– “রাফি, মুখটা এমন ভার করে রেখেছ কেন?”
– “না চাচা, কিছু হয়নি।”
– “না না, কিছু একটা হয়েছে। না হলে তুই এমন চুপচাপ থাকিস না।”
রাফি এবার মিষ্টি করে হেসে বলল,
– “চাচা, আমরা বিকেলে গরুর হাটে যাব, তাই ভাবছিলাম।”
রাতুল আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
– “বাবা, আমি লাল রঙের গরু কিনব, কিন্তু গরুটি শান্ত হতে হবে!”
– “আচ্ছা বাবা, তুমি যা চাইবে, তাই হবে,” বললেন তার বাবা।
রাফিকেও ডাকলেন সঙ্গে যেতে।
রাতুল খুশিতে আত্মহারা।
– “রাফি, এবার কোরবানির ঈদে আমরা খুব মজা করব!”
হাট থেকে ফেরার সময় বাবা ধমকে বললেন,
– “রাতুল, তোকে দিয়ে কিছুই হয় না। একটাও কাজ ঠিকমতো করিস না!”
– “আর কতক্ষণ লাগবে?”
– “বাবা, আর ১০ মিনিট।”
– “ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি কর।”
গরুটি ছিল ঠিক যেমনটা রাতুল চেয়েছিল–রঙচঙে লাল, শান্তশিষ্ট। গরুর মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল,
– “তুমি এখানেই থাকো, তোমার জন্য খাবার আনছি।”
ঈদের রাতটা কেটেছিল নির্ঘুম অপেক্ষায়।
ভোরে নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি করে। গরু, খাসি জবাই হয়। মাংস ভাগ হয়ে যায়। কেউ কেউ ফ্রিজে রাখে, কেউ আবার প্যাকেট করে নিয়ে যায়।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাতুল হা করে তাকিয়ে থাকে। দেখতে পায়, এক বৃদ্ধ মানুষ এখান থেকে ওখানে ছুটোছুটি করছেন।
রাতুল কাছে ডাকতেই বৃদ্ধ হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।
– “বাবা, সারা বছরে গরুর মাংস খাইতে পারি না। আজ কোরবানির দিনেও কেউ এক টুকরা মাংস দিল না। আমার পোলাপাইনরা পথ চেয়ে আছে, আমি খালি হাতে ফিরতেছি।”
রাতুলের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। বুকের ভেতর কেমন জানি মোচড় দেয়। বৃদ্ধের চাহনি আর চোখের জল যেন আকাশের আরশ কাঁদিয়ে দেয়, তার আগেই কাঁদায় রাতুলের মন।
সে বাবাকে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
– “বাবা, আমরা তো সারা বছর মাংস কিনে খেতে পারি। ওরা তো গরিব। এত দামে মাংস কীভাবে কিনবে?”
রাতুল ফ্রিজ থেকে কয়েক টুকরো মাংস এনে হাতে দেয় বৃদ্ধকে।
সেই মুহূর্তে রাতুলের মনে হলো, সে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কাজটি করেছে। সেই হাসিই যেন ঈদের আসল আনন্দ।







