এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় খাল সংস্কার ও স্লুইচসগেট নির্মাণের পাশাপাশি ছোট নালা ও খালগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বড় খালগুলো সংস্কার করলেও পানি যদি ছোট নালা থেকে খালে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে না। গতকাল বুধবার টাইগারপাস নগর ভবনে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সভাপতিত্ব করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এরশাদ উল্লাহ বলেন, চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে আমার সংসদীয় এলাকার বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেছি। এ সময় কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকার নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও আবার রাস্তার নিচ দিয়ে পানি পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রস ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারছে না।
এরশাদ উল্লাহ বলেন, চট্টগ্রাম–৮, ৯, ১০ ও ১১ সংসদীয় এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে মেয়র যে কমিটিগুলো গঠন করেছেন, সেসব কমিটির সুপারিশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বসে সমন্বিতভাবে করণীয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু বড় খাল পরিষ্কার, সংস্কার বা সুইসগেট নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না, ছোট নালা থেকে বড় খাল এবং সেখান থেকে নদী পর্যন্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতার পানি মূলত বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বৃষ্টির পানি এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা করতে হবে। এসব পানি যদি নালা–নর্দমায় গিয়ে আটকে থাকে, তাহলে বড় খাল সংস্কার করেও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না।
সংসদ সদস্য বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর আগামী বর্ষার আগেই যেসব খাল ও নালা এখনও পরিষ্কার করা হয়নি, সেগুলো চিহ্নিত করে পরিষ্কার করতে হবে। যেসব এলাকায় নালা নতুন করে নির্মাণ বা সংস্কার প্রয়োজন, সেসব কাজও বর্ষার আগেই সম্পন্ন করা দরকার। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম–৮ আসনের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো মেয়র নিজেও একাধিকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এসব এলাকার ছোট নালাগুলোকে বড় নালা ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত করার পাশাপাশি যেসব স্থানে ক্রস ড্রেনেজ প্রয়োজন, সেগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
এরশাদ উল্লাহ বলেন, বিভিন্ন খালের প্রস্থ ও সীমানা নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোনো রেকর্ডের পার্থক্য রয়েছে। কোথাও খালের আগের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। খালের প্রকৃত জায়গা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধার করা না হলে ভবিষ্যতে আবারও জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হবে। তাই আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় চট্টগ্রাম–১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি খাল বা নালা সংস্কার করলে হবে না, পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খাল সংস্কারের পাশাপাশি নালাগুলো সচল রাখা এবং ছোট খালগুলোর সঙ্গে বড় খালের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সামপ্রতিক সময়ে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি দেখেছেন, চট্টগ্রাম ১০ আসনে ৪টি খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব খালকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় এবং মহেশখালের সঙ্গে কীভাবে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মহেশখাল দীর্ঘ ও প্রশস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ ব্যবস্থা হলেও এর সক্ষমতা ও অবকাঠামোকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সাঈদ আল নোমান বলেন, নালা সংস্কার না করে শুধু খাল সংস্কার করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। আবার খাল সংস্কার করেও নালাগুলো সচল না রাখলে পানি খালে পৌঁছাবে না। তাই খাল, নালা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের সংযোগগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। এটি একটি সমন্বিত বিষয়।
তিনি বলেন, প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যে কমিটিগুলো গঠন করেছেন, সেগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জন্য দুই–তিনজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি দায়িত্বশীল টিম নির্ধারণ করা যেতে পারে, যারা সংশ্লিষ্ট এলাকার খাল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
সাঈদ আল নোমান বলেন, স্লুইচগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত বৈঠক করা যেতে পারে। সেখানে কোন স্লুইচগেট কোথায়, এর মালিকানা কার, এর সক্ষমতা কতটুকু এবং কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে–এসব বিষয় চিহ্নিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেকগুলো প্রকল্প ও অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন এগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে এসে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলাবদ্ধতা সমস্যাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত পুুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক কর্ণেল তারিকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর চলমান প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি বৈধ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। এখনো কয়েকটি স্থাপনা অপসারণ বাকি রয়েছে, যেগুলোও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়, খাল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো ও স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে নগরীর স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলো পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের যে কাজ করা হচ্ছে, তা সহজ কোনো কাজ নয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ এবং মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে কাজ করার কারণেই এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন খালের সংস্কার ও প্রশস্তকরণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই হবে না, কাজ শেষ হওয়ার পর এসব খাল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।











