
মাত্র ক‘দিন আগের একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি।
লর্ডসে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় টেস্ট চলার মাঝেই পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানের দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খানের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে স্কাই স্পোর্টস। ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার মাইকেল আথারটনের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের কারাবাস ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিস্ফোরক সব অভিযোগ করেন তাঁর দুই ছেলে। সাক্ষাৎকারটি নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আপত্তি জানালেও তা প্রচার করায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পাকিস্তান।
বৃহস্পতিবার লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম সেশন শেষ হওয়ার পর মধ্যাহ্নবিরতিতে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়। পিসিবির পক্ষ থেকে আগে থেকেই স্কাই স্পোর্টসকে সাক্ষাৎকারটি প্রচার না করার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে সেই আপত্তি উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময়েই সাক্ষাৎকারটি সমপ্রচার করে ব্রিটিশ সমপ্রচারমাধ্যমটি। বিষয় যখন গণ মাধ্যমের স্বাধীনতা তখন গল্পটি প্রাসঙ্গিক।
বলে রাখি পশ্চিমা নামে পরিচিত দেশগুলোতে মিডিয়ার যে স্বাধীনতা তা আমাদের মতন দেশ ও সমাজে নাই। কেন নাই? তার হাজারটা কারণ ও তথ্য তুলে দেয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা এই, বাংলাদেশ বা উপমহাদেশে বাক স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা এবং চিন্তার স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ। এই যে পাকিস্তান এই ইন্টারভিউ নিয়ে গোস্বা করলো এমন কি খেলাটা বাতিল করারও হুমকি দিয়েছিল তার কারণ কী?
যখন আপনি কোনো আয়নার সামনে দাঁড়ান এবং নিজেকে উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন বা রাজ্জাক কবরীর মতো দেখতে লাগে আপনি কি সেই আয়না ভাঙবেন? না ভাঙার ব্যাপারে সহমত হবেন? আর যদি সেই আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে আগ্রাসী, দানবের মতো বা ভয় পাওয়া কোনো কিছুর মতো লাগে আপনি হয় সেই আয়না ভেঙে ফেলবেন নয়তো নিজেই এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দূরে সরে যাবেন। প্রকৃত চেহারা দেখতে ভয় পাওয়া মানুষ শাসক বা সমাজের এটাই বাস্তবতা। যে কারণে পাকিস্তান সরকার এর প্রতিবাদ করেছিল।
ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পাশাপাশি মিয়ানমার বা পাশের দেশগুলিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো সম্পূর্ণ ধরা দেয় নি। তুলনামূলকভাবে ভারতের অবস্থা অনেক ভালো। অনেক বেশি তথ্য আর সঠিক খবর পাওয়া যায় সে–দেশের মিডিয়ায়। যার বড় কারণ গণতন্ত্র। সে দেশের নির্বাচন বা ফলাফল নিয়ে মিডিয়ার খবরে বিশ্বাস করে না এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোণা। উল্টোদিকে আমাদের কথা ভাবুন। এমন একটা সময় পার হতে হয়েছিল যখন নির্বাচন আদৌ হচ্ছে কী না তার নাই হদিস অথচ রাতের খবর জুড়ে রমরমা জয় পরাজয়ের গুজবে খবর। মিডিয়ার স্বাধীনতা তখন কি আসলেই ছিল? না আজও আছে?
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়টি কেবল মুখের কথা না। এর জন্য আইন আছে নিয়ম কানুন আছে। কিন্তু সরকার আসে সরকার যায়। নিয়ম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আর মুখ লুকায়। বিষয়টি এভাবে দেখি: বাংলাদেশের গণমাধ্যম গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। গণমাধ্যম জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করে, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, জনমত গঠন করে এবং সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জাতীয় সংকটের সময়ে গণমাধ্যম জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য প্রচারে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। অনলাইন এবং মূলধারার অনেক গণমাধ্যম এখনও সাহসিকতার সাথে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকারের বিষয়গুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এটি সরকার, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম কর্মীদের নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করার এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেয়।
এই কথা বলার পর যা বলতে হবে, এখনো আমাদের মিডিয়া বুক চিতিয়ে মুখ খুলে হাত খুলে না পারছে বলতে না লিখতে। সরকারের একটি মিডিয়া থাকলে থাকুক চালিয়ে যাক তাদের প্রচার প্রচারণা । কিন্তু সব মিডিয়া একযোগে হুক্কা হুয়া ধ্বনি তুললে বিপদ কিন্তু সরকারের বেশী। আবারো বলি ষোল বছর ধরে প্রচার বা একপেশে সবকিছু কেমন নিমিষে তাসের ঘরের মতো ধ্েস পড়েছিল, এটা সবাই ভুলে গেলে কী সময় ছেড়ে কথা বলবে?
বাংলাদেশের মানুষ খবর পিয়াসী। আমি এই অস্ট্রেলিয়ায় বাস করছি বিগত তিরিশ বছর ধরে। মানুষ অবশ্যই খবর দেখে খবর জানে পত্রিকা টিভি রেডিও সব দেখে বা শোনে। কিন্তু আমাদের মতো খবরের বৈচিত্র্য নাই। যার মূল কারণ সেটেলড রাজনীতি। রাজনীতি ও অর্থনীতি মিলে যে সমাজ তাতে মানুষ সাবধানী থাকে। কারণ কিছু গন্ডগোল হলে বা বিপত্তি বাধলে মানুষের লোকসান ছাড়া লাভ নাই। আমাদের দেশের মতো আকছার খুন জখম রাহাজানি নাই এদেশে। যে গুলো ঘটে বা হয় তার জন্য নতুন নতুন গল্প বা সরকার ও প্রশাসন ভেদে নতুন কাহিনির প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের এমনই কপাল একজোড়া সাংবাদিক খুন হয়েছিল সেই কবে আজো তার সুরাহা হয় নি। প্রতিবার বদলে যাওয়া নতুন গল্পে দিশেহারা মানুষ উদভ্রান্ত মিডিয়াও দিশেহারা বটে। রংপুরের ঘটনার কথাই ধরি। কে জানে কোন পথে এগুবে এবং কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার শেষ ভাগ।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো অমূলক বা গল্পের বিষয় না। আমরা যদি অতীতের দিকে তাকাই মাঝে মাঝে যে সময়টুকুতে আমাদের দেশের মিডিয়া ঝলসে উঠতে পেরেছিল সে সময়টাতেই জয়ী হয়েছিল সমাজ জয়ী হয়েছিল আমাদের স্বদেশ। আজ আমরা এমন এক সভ্যতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছি যখন মানুষ নিজেই একেকটি মিডিয়া। যার হাতে মোবাইল তার হাতেই ক্যামেরা। আর ছবি ও বলতে থাকা ঘটনার বিবরণও এক ধরনের মিডিয়া বৈকি। কে অস্বীকার করবে এই সোশ্যাল মিডিয়া কত রহস্য উন্মোচন করেছে কত ঘটনা সুরাহা করার পথ দেখিয়েছে। সামাজিক মিডিয়া একদিকে যেমন শক্তিশালী তরবারী আরেকদিকে খোলা ছুরি। এর ওপর নির্ভর বা বিশ্বাস করার একটা সীমা আছে । অন্যদিকে মুদ্রিত ও ডিজিটাল টিভি মিডিয়া একবার যা বলে বা দেখায় সেটাই স্থায়ী। পরে দুঃখ প্রকাশ করা বা মাফ চাইলেও যা বলার বা যা লেখার তা কিন্তু হয়েই যায়।
বলছিলাম গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে। গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা আসলে ব্যক্তি বা সমাজের পাশাপাশি দেশের ওপর নির্ভরশীল। গণতন্ত্র বাক স্বাধীনতা আর চিন্তার মুক্তি ছাড়া তা অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা তাকে অস্বীকার করলে বা তাকে সাথে নিয়ে না এগোলে দেশ এগোবে কীভাবে? স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে এক বিপন্ন বিস্ময় ও ঘোরের মধ্যে আছি। আশা করি এই ঘোর বিপদ কেটে স্বাধীনতার আলো আমাদের গণমাধ্যমকে মুক্ত আলোয় রাখবে। যাতে দেশ সমাজ ও মানুষের আস্থা আর ভালোবাসা জয়ী হবে। জয়ী হবে বাংলাদেশ।
লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, কবি ও সাহিত্যিক












