মূল্যবৃদ্ধির অরাজকতা তৈরির সুযোগ দেওয়া যাবে না

| শনিবার , ১৪ মে, ২০২২ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে সারা দেশ অস্থির। এ অবস্থায় পেঁয়াজের দামও বাড়তে শুরু করেছে। দেখে শুনে বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন, দেশে এক ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। না হয় একটার পর একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কেন। গত ১২ মে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, তেলের বাজারের উত্তপ্ততার মধ্যে ঝাঁজ বাড়ছে পেঁয়াজের। নগরীর বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই খাতুনগঞ্জে একদিনেই পেঁয়াজের দর বেড়েছে ৮ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। গত বুধবার সকালে চাক্তাই খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের বাজার শুরু হয় ৩০ টাকায়। বিকেল গড়াতেই দাম উঠে যায় ৩৮ টাকাতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকট রয়েছে। মূলত ভারতীয় পেঁয়াজের ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) শেষ হওয়ায় দেশের স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। যার ফলে দাম বাড়ছে। নগরীর চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৮ টাকায়। ঈদের আগে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৫ টাকায়। বর্তমানে দেশে তাহেরপুরী, বারি-১ (তাহেরপুরী), বারি-২ (রবি মৌসুম), বারি-৩ (খরিপ মৌসুম), স্থানীয় জাত ও ফরিদপুরী পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ফলে বছরজুড়েই কোনো না কোনো জাতের পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে। দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। এর মধ্যে ১৮ লাখ টন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়। আর আমদানি করা হয় বাকি চার লাখ টন। মূলত এই আমদানিকৃত চার লাখ টন পেঁয়াজ বাজারের ওপর খুব বড় প্রভাব ফেলে।

কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার লিখেছিলেন, ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ব্যবস্থা বাস্তবে আমাদের দেশে নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সরকারের থাকে না- এই অজুহাতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বা খামখেয়ালিপনা দেখেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। একশ্রেণির মুনাফালোভী মানুষের খেয়ালখুশির ওপর চলছে আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনা। তারা যখন খুশি, তখনই কোনো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেদার মুনাফা লোটেন। কখনো হয়তো দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণ ছাড়াই স্রেফ ক্রেতাদের পকেট কাটার মতলবেই দাম বাড়ানো হয়। একবার একটি পণ্যের দাম বাড়লে তা কখনো কমে আগের দামে আসে না। পৃথিবীটাই তো পরিবর্তনশীল। সবকিছুই তো বদলায়। কিছুই আগের মতো থাকে না। তাই জিনিসপত্রের দাম আগের মতো থাকে কীভাবে?

কারসাজি করেই সাধারণভাবে বাজারে দাম বাড়ানোর ঘটনাটি ঘটে বলে মনে করা হয়। প্রশ্ন হলো, কারা করে কারসাজি? উৎপাদকরা কারসাজি করেন না। কৃষিজাত পণ্যের দাম নির্ধারণে উৎপাদক কৃষকদের কি কোনো হাত থাকে? তারা তো ফসলের ন্যায্য দাম থেকে যুগের পর যুগ ধরেই বঞ্চিত হয়ে আসছেন। কৃষক তো অনেক সময় উৎপাদিত ফসলের দাম উৎপাদন খরচের থেকেও কম পান। ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমাদের কৃষকদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যারা ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী- তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে বা নির্ধারণ করে নিজেদের ভাগ্য ঠিকই পরিবর্তন করেন। অভিযোগ করা হয়েছে, একেক ব্যবসায়ী একেক অজুহাতে ভোক্তাদের পকেট কাটছেন। তেলের দামে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড করেছে। এবার এর সাথে যুক্ত হয়েছে পেঁয়াজের দাম। ব্যবসায়ীদের দোকান গুদামে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ থাকার পরেও তারা একদিনে পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এখন নিজের খুশি মতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে সংশ্লিষ্টরা, যা খুবই অ্যালার্মিং। এতে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হবে। দেশের অভ্যন্তরে কোনো ক্ষেত্রে যাতে অরাজকতা তৈরি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সব দিকে সরকারকে নজর রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকার তার দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অবহেলা কিংবা অসততার আশ্রয় নিলে তখন আর স্বাভাবিক অবস্থা থাকে না। আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। যারা সাধারণ মানুষের পকেট কেটে নিজের পকেট ভারী করার তালে থাকে, তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কখন কী করলে মুনাফা বাড়বে, তার ফন্দিফিকির করতে তারা ওস্তাদ। এ ফন্দি ফিকিরকেই আসলে ভালো বাংলায় কারসাজি বলা হয়। একশ্রেণির ব্যবসায়ী কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করলেও সরকার কেন শক্ত অবস্থান নিতে পারে না? সেই প্রশ্নটা এখন মানুষের মুখে মুখে। বলা প্রয়োজন যে অরাজকতা তৈরির যাবতীয় চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিতে হবে।