বৈশাখের কঠিন খরতাপ, প্রকৃতি থেকে ছড়িয়ে পড়ছে যেন আগুনের হুল্কা। শুঁটকি উৎপাদনের জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ আর হতে পারে না। কিন্তু এমন অনুকূল পরিস্থিতিতেই বন্ধ হয়ে গেছে দেশের নামকরা কক্সবাজারের নাজিরারটেকের শুঁটকিপল্লীর অন্তত ৬০০ মহাল। সাগরে মৎস্য নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ সংকটে পড়ে এসব শুঁটকি তৈরির মহাল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজ হারিয়েছে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক আর লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ শিকারে ৫৮দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় মহালগুলোতে মাছ আহরণ বন্ধ হয়ে গেছে। আমদানি করা মাছও নেই গুদামে। শুধুমাত্র গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর গুদামে থাকা আদমানি করা মাছ নিয়ে চালু রয়েছে মাত্র শতাধিক মহাল। মাছ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলোও শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তারা। শুঁটকি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লি. সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের সমুদ্র উপকূলীয় নাজিরারটেক এলাকায় ৭০০টির মতো শুঁটকিমহালে শুঁটকির উৎপাদন হয়। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুঁটকির ভরা মৌসুম ধরা হলেও উৎপাদন চলে সারা বছর। নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় এখানকার অন্তত ৬০০টি মহালে শুঁটকির উৎপাদন বন্ধ আছে বলে জানিয়েছেন মালিকেরা। বিদেশ থেকে আমদানি করা কিছু মাছ দিয়ে ৮০–১০০টি মহালে অল্প কিছু শুঁটকির উৎপাদন চলছে। এতে কাজের সুযোগ মিলেছে কয়েকশ শ্রমিকের। শুঁটকি ব্যবসায়ী সভাপতি শাহাদাত উল্লাহ জানান, ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞায় সাগরে মাছধরা বন্ধ থাকা ও আমদানি করা মাছের স্টক শেষ হয়ে যাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কিছুদিন পর হিমাগারে রক্ষিত আমদানি করা মাছ শেষ হয়ে গেলে শুঁটকির উৎপাদনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন জানান, গত আট মাসে কক্সবাজার উপকূলে তেমন মাছ ধরা পড়েনি। আগে ট্রলারের জালে ধরা পড়া বিপুল পরিমাণ মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ নাজিরারটেক, নুনিয়াছটা, মগচিতাপাড়াসহ বিভিন্ন উপকূলে শুঁটকির উৎপাদনে ব্যবহৃত হতো। এখন এখানকার ৬৫০টি মহাল বন্ধ। চট্টগ্রাম থেকে ভারত ও ওমান থেকে আমদানি করে আনা কিছু মাছ সংগ্রহ করে নাজিরারটেকে ৬০টির মতো মহালে শুঁটকির উৎপাদন হচ্ছে। শুঁটকি তৈরির আদর্শ সময় গ্রীষ্মকাল। অথচ এখনই মহাল বন্ধ। প্রচণ্ড তাপও কাজে লাগছে না। শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০ হাজারের বেশি শুঁটকিশ্রমিক পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছেন, যাঁর এক–তৃতীয়াংশই নারী।
শুঁটকি উৎপাদনের শ্রমিক কুতুবদিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা আছিয়া খাতুন (৪০) বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে বোট ডুবে ১০ বছর আগে স্বামী মারা যান। এরপর থেকে আমি ও এক মেয়ে শুঁটকি উৎপাদনের কাজ করে পরিবার চালাচ্ছি। নারী হিসেবে আমাদের পারিশ্রমিকও কম। যা পাই তা দিয়ে সংসার চলে। বছরের জন্য দাদন নিয়ে খাই। কিন্তু এবার দুই মাস আগে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে খাবার জোগাড় নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেছি।
আরেক নারী শ্রমিক কুলচুমা আকতার বলেন, পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন। স্বামী রিক্সা চালায়। তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই আমি শুঁটকি উৎপাদনের কাজ করে সহযোগিতা করি। এবার দুই মাস আগে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারে অভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদন দুই মাস আগে বন্ধ হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রায়ও বড় ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এতে বেড়ে যাবে দামও।
জেলা মৎস্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজারে শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে ৩১হাজার মেট্রিক টনের বেশি। আগের অর্থবছরের ১২মাসে শুঁটকির উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে ৪ হাজার টন শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে। এ অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টন। শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন শুঁটকির উৎপাদন বাড়াতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় পেছানো উচিত বলে মন্তব্য করেন।














