মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী স্মরণে

সিঞ্চন ভৌমিক | সোমবার , ১৭ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ

লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছরের গবেষণার ফসল ‘ভাসানীচরিত’ বইটি না পড়লে আমার মানবজীবন অপূর্ণ থেকে যেত। বইটির প্রতিটি শব্দ আমার অন্তর্জগৎকে উজ্জীবিত করেছে। একজন মানুষ কতখানি জ্ঞানপিপাসু হলে এমন একটি গ্রন্থ রচনা সম্ভব, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। ভাসানীর জীবন, সংগ্রাম, দর্শন ও রাজনৈতিক চেতনার এমন সুগভীর বিশ্লেষণ বাংলা সাহিত্যে বিরল। নেতা ও জননেতা দুটি ভিন্ন পরিচয়। দলের নেতা হওয়া সহজ, কিন্তু জনগণের নেতা হয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন। সেই কঠিন পথ অতিক্রম করেই মাওলানা ভাসানী হয়ে উঠেছিলেন মজলুম জননেতা। তাই তিনি আজও আমাদের জাতীয় জীবনে প্রাতঃস্মরণীয়। আমার বিশ্বাস, রাজনীতি জানতে, শিখতে ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করতে চাইলে ভাসানীকে না জেনে একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ বা সমাজকর্মী হওয়া কঠিন।

শৈশবে মাবাবাকে হারানোর কারণে তিনি নিজের জন্মতারিখও নিশ্চিতভাবে জানতেন না। তাঁর সর্বশেষ পাসপোর্টে জন্মতারিখ ১২ ডিসেম্বর ১৮৮০ উল্লেখ ছিল। তিনি নিজেই লিখেছেন, ১৩০৪ বঙ্গাব্দের মহাপ্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় পনেরো বছর। সিরাজগঞ্জের ধনপাড়া গ্রামে হাজী শরাফত আলী ও বেগম শরাফত আলীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ খান। তিনি সবসময় শোষিত, বঞ্চিত ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেখান থেকেই তিনি লাভ করেন ‘মজলুম জননেতা’ অভিধা। ১৯২৪ সালে আসামের ধুবড়ি জেলার ভাসানচরে কৃষক সম্মেলনে স্থানীয় মানুষ ভালোবেসে তাঁকে ‘ভাসানী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর থেকেই তিনি ইতিহাসে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী নামে অমর হয়ে আছেন।

ভাসানীর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। তিনি কৃষকের পোশাককেই নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক বানিয়েছিলেন। দেশবিদেশে সর্বত্র তিনি সাধারণ মানুষের পোশাক পরিধান করেছেন। আজ যখন অনেক রাজনীতিবিদ ব্রিটিশদের রাজকীয় পোশাককে মর্যাদার প্রতীক মনে করেন, তখন ভাসানীর সরল জীবনযাপন আমাদের নতুন করে আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। আমাদের মনে রাখা উচিত, এই উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়িত করতে পূর্বপুরুষদের প্রায় দুই শতাব্দীর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করতে হয়েছে।

মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন, “রাজনীতি হলো একটি মহৎ কর্মপ্রয়াস, যার লক্ষ্য সমাজ থেকে অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটানো।” এই আদর্শ নিয়েই তিনি তেইশ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপসহীন ভূমিকা পালন করেন। তিনিই প্রথম প্রকাশ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে মানুষ।” রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন যুগান্তকারী। হরতালের পাশাপাশি অনশন, ঘেরাও, লংমার্চসহ নানা কর্মসূচিকে তিনি গণআন্দোলনের নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধিও ছিল অসাধারণ। মিছিল চলাকালে পুলিশ বাধা দিলে তিনি সমর্থকদের নিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষে তাঁর মোনাজাত হতো অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বানে মুখর। ধর্মকে তিনি কখনো বিভেদের অস্ত্র বানাননি; বরং মানুষের মুক্তির শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

ভাসানী মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছিলেন একজন খাঁটি অসামপ্রদায়িক মানুষ। ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও তিনি সব ধর্মের মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সৈয়দ আবুল মকসুদের ভাসানীচরিত থেকে জানা যায়, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাসানীর রাজনীতি, বিশেষ করে ১৯৫০ ও ১৯৬০এর দশকে তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর, ৯৬ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, কুর্নিশ ও লাল সালাম।

লেখক : প্রকৌশলী

পূর্ববর্তী নিবন্ধনানা সুতার নকশা
পরবর্তী নিবন্ধঅবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া