মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬–২০১৬)। বাংলা সাহিত্যেও অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় নিবেদিত একজন সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নম্বর জিন্দাবাহার লেনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনীষ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের প্রখ্যাত সাহিত্যিক এবং মাতা ধরিত্রী দেবী ছিলেন কবি। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক ছিলেন তাঁর কাকা। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পারিবারিক পরিবেশ তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৪৬ সালে শান্তিনিকেতন থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ. সম্পন্ন করার পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ.-তে ভর্তি হন। তবে সামপ্রদায়িক দাঙ্গার কারণে পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি ঘটে এবং ১৯৬৩ সালে তিনি এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। লেখালেখিকে জীবনের প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করার লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যজীবনের সূচনা হয় ইতিহাসভিত্তিক জীবনীগ্রন্থ ‘ঝাঁসীর রাণী’ (১৯৫৫) প্রকাশের মাধ্যমে। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘অগ্নিগর্ভ’, ‘চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর’, ‘তিতুমীর’ এবং ‘কৈবর্ত খা’। এছাড়া ‘দ্রৌপদী’, ‘শিকার’, ‘জাতুধান’ প্রভৃতি ছোটগল্পে তিনি সমাজের শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার শক্তিশালী শিল্পরূপ নির্মাণ করেছেন। তাঁর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রান্তিক, আদিবাসী ও বঞ্চিত মানুষের জীবনসংগ্রামকে সাহিত্যের কেন্দ্রে স্থান দেওয়া। অসামান্য সাহিত্যকর্ম ও সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৭৯), পদ্মশ্রী (১৯৮৬), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৯৬), ম্যাগসেসে পুরস্কার (১৯৯৭), পদ্মভূষণ (২০০৬) এবং সার্ক সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭)সহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হন। ২০১৬ সালের ২৮ শে জুলাই তিনি ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামকে সাহিত্যের প্রধান বিষয় করে বাংলা সাহিত্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মহাশ্বেতা দেবী আজও স্মরণীয় ও অনুকরণীয়।










