ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ নতুন মোড় নিচ্ছে। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের খারাপ ফল নিয়ে অসন্তোষ এবং দলে ভাঙনের পর দলটির এক সময়ের কংগ্রেসি নেতাদের পুরনো ঘরে ফেরার জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে। রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দল আগেই নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের হাতছাড়া হয়েছে। লোকসভাতেও তৃণমূলের সংসদীয় দল হাতছাড়া হয়েছে তার। মমতা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক করতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে থাকার মধ্যেই বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এনডিএ জোটকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় স্পিকারকে। মঙ্গলবার ভারতের বিরোধীদল কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন মমতা। গতকাল বুধবার সকালে আবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে যান অভিষেক। ইন্ডিয়া জোটে সমন্বয় শক্তিশালী করার চেষ্টার মধ্যেই বুধবার নেতাদের এই বৈঠক হয়। দেড় ঘণ্টার সেই বৈঠক ঘিরেই প্রশ্ন উঠছে, মমতা–অভিষেক কি তাহলে তাদের পক্ষে থাকা তৃণমূলকে নিয়ে কংগ্রেসে যোগ দেবেন? ১৯৯৭ সালে যে কংগ্রেসের হাত ছেড়ে মমতা বন্দোপাধ্যায় নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গড়েছিলেন, শেষমেশ সেই কংগ্রেসেই কি ফিরছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী? এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সেই সম্ভাবনার পাশে এখনও এই প্রশ্নবোধক চিহ্নই রাখছেন। খবর বিডিনিউজের। রাজনীতিতে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ২৯টি এবং রাজ্যসভায় ১২টি আসন নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি–বিরোধী জোটের তৃতীয় বৃহত্তম দল হওয়ার পরও, তৃণমূল এতদিন কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বধীন এনডিএ জোটকে আক্রমণ করেছে নিজস্ব কৌশলে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মমতার সম্পর্ক খুব খুব একটা ভাল ছিল না। গত কয়েক বছর এমনও অবস্থা ছিল যে, ইন্ডিয়া জোটে কংগ্রেসের নেতৃত্বই মানতে অস্বীকার করছিল তৃণমূল। এমনকি কলকাতায় বসে কুণাল ঘোষের মতো নেতারা বলেছিলেন, কংগ্রেসের ‘বিগ ব্রাদার অ্যাটিচিউড’ ছাড়তে হবে। তাহলে এখন কেন তাদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা– সেটি নিয়ে নতুন জল্পনা সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতার মুখোমুখি বৈঠক হয়, যা কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম। বৈঠকের বিষয়বস্তু ছিল ‘তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এবং জোটের রাজনীতি।’ মমতা টানা ১৫ বছর বা দেড় দশক পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং তার দল তৃণমূল সেখানে একচ্ছত্র শাসন উপভোগ করেছে। তৃণমূল নেতারা দুর্নীতি, জোরজুলুম, নিপীড়ন ও দমনের মাধ্যমে শাসন চালিয়েছিলেন এবং দলটিকে অপরাজেয় মনে হত। আরও মনে হত কোনও ঝড়ই এর ক্ষতি করতে পারবে না। মমতা পশ্চিম বঙ্গের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তার শক্তি এতটাই ছিল যে, তিনি তার এমপি’দের জোরে জাতীয় রাজনীতিতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের পর সবকিছু বদলে গেল। যে নেতাকে একসময় অটল এবং যে দলটিকে বাংলায় অপরাজেয় মনে হতো, তারা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ঝড়ে ভেসে গেছে। এটি যেমন মমতার বিরুদ্ধে ভোট ছিল, তেমনি ছিল বিজেপির পক্ষে ভোট। ২৯৪ সদস্যের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে নেমে আসে। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ টিভির কলকাতা ব্যুরোর সিনিয়র এডিটর ইন্দ্রজিৎ কুণ্ডু মঙ্গলবার এক সমপ্রচারে জানান, এই অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যে মমতাকে কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিকল্প ‘পরামর্শ দেওয়া হয়েছে’ বলেই তিনি শুনেছেন।
১০০ জনের বেশি তৃণমূল কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ৬০ জনের বেশি বিধায়ককে নিয়ে মমতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদার ২৮ জন এমপির মধ্যে ২০ জনেরও বেশি এমপির সমর্থন দাবি করে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ–জোটকে সমর্থন জানিয়েছেন। নির্বাচনের ফলের এক মাসের মধ্যে মমতা দলটির একচ্ছত্র অভিভাবক থেকে নিজের গড়া দলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু করেছেন। কিন্তু শিবসেনা এবং এনসিপি–র আগের উদাহরণগুলো দেখে তিনি নিশ্চয়ই জানেন যে, তার জয়ের সম্ভাবনা খুব কম। কারণ বিদ্রোহী শিবিরে বিধায়ক ও সংসদ সদস্যদের যে সংখ্যা রয়েছে, তা দলত্যাগ বিরোধী আইনকে নিষ্ক্রিয় বা বাতিল করে দেবে। তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা ও বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস–তৃণমূলের মিশে যাওয়ার গুঞ্জন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ৬৪ জন বিদ্রোহী বিধায়ক এবং প্রায় ২০ জন এমপি কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের যোগ দেওয়া সমর্থন করবে না। ঋতব্রত বলেন ‘আমরা তো এখানে তৃণমূল কংগ্রেস। আমরা তো মিশে যাচ্ছি না! আমাদের বিধায়করা এটা করবেন না। ২০ জন এমপি কংগ্রেসে যোগ দেবেন না, তাহলে বিলীন হচ্ছে কে? কংগ্রেসের সঙ্গে এমন একীভূতকরণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’












