ভূমিকম্প : বেশি ঝুঁকিপূর্ণ নগরের তিন ওয়ার্ড

নিয়মিত ঝুঁকি ম্যাপিং করার পরামর্শ

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ

ভূমিকম্পের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত আছে নগরের তিনটি ওয়ার্ড। এগুলো হচ্ছে ৮নং শুলকবহর, ১৫ নং বাগমনিরাম এবং ১৬ নং চকবাজার। এছাড়া ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে শহরের ৯৩ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৬১ শতাংশ ভবনের ক্ষতি হতে পারে। রাতের বেলা একই মাত্রার ভূমিকম্প হলে ভবন ধসে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ মারা হওয়ার আশংকা রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রণীত ‘মাল্টি হ্যার্জাড কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ফর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’ তথা চট্টগ্রাম মহানগরীর আপদকালীন কর্মপরিকল্পনায় খসড়ায় এসব তথ্য উঠে আসে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেভ দ্যা সিলড্রেন ও ইপসা কর্মপরিকল্পনাটি প্রণয়নে সহযোগিতা করে। গত সপ্তাহে কর্মপরিকল্পনাটি নিয়ে একটি সভাও হয়েছে।

কর্মপরিকল্পনাটি ‘চট্টগ্রাম শহরের ভূমিকম্প কন্টিজেন্সি প্ল্যান’ এর বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করে বলা হয়, রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এক লাখ ৬৮ হাজার ৭৮৩টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৭৩৪টি বিদ্যালয় ভেঙে পড়তে পারে এবং ১২৫টি হাসপাতাল-ক্লিনিক সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৫৩টি ভবন মাঝারিভাবে এবং রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার ৭৮২টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিকম্প হলে পুরো শহরে ব্যাপক প্রাণহানি বাড়বে। রাতের বেলায় প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট- ১ থেকে ৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা ভূমিকম্পের উৎপত্তি হলে ভূমিকম্প ও ভবন ধসে পরপরেই প্রায় ১৫ হাজার মানুষ নিহত হওয়ার আশংকা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় আনুমানিক সাত হাজার লোককে হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এছাড়া ভূমিকম্পে মোট ১৩ লক্ষ ৩৫ হাজার মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষ উৎপন্ন হতে পারে। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ অপসারণের জন্য আনুমানিক ৫৩ কোটি ৪০ লক্ষ ট্রাকলোড (২৫ টনের ট্রাক) দরকার হতে পারে। শক্তিশালী ভূমিকম্প পরবর্তী প্রভাব এবং বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সাথে সহ-ভূমিকম্প কয়েকদিন ধরে চলতে থাকবে যার ফলে আরও ভবন ধসে পড়বে। ধ্বংসাবশেষ, ভূমিধস, ভেঙে পড়া ব্রিজ ইত্যাদির কারণে নগরীতে চলাচল ও প্রবেশ মারাত্মকভাবে সীমিত হতে পারে।

প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট ২ এবং প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট ৩ এর কাছাকাছি অবস্থান এবং টেকটোনিক ফল্টে বিরতি, সিসমিক কম্পন এর কারণে চট্টগ্রাম শহর ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে কনসাল্টেন্ট হিসেবে কাজ করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ জালাল মিশুক। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ঝুঁকির্পূণ ভবন ও কাঠামো চিহ্নিত করার জন্য নিয়মিত জরিপ করার উদ্যোগ নিতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি ওয়ার্ডে উচ্ছেদ কেন্দ্র প্রস্তুত করতে হবে। নিয়মিত ঝুঁকি ম্যাপিং করতে হবে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ উপাদান সঠিকভাবে ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে ভূমিকম্প বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল তথা হিমালয় বেল্টে অবস্থান করায় ঝুঁকিতে আছে চট্টগ্রাম। ১৯৭৯ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ সিসমিক জোনিং ম্যাপেও চট্টগ্রামকে সবচেয়ে বিপদসংকুল অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। দেশের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালও ২০১৫ সালে তাঁর গবেষণায় চট্টগ্রামের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। বর্তমানে জুরিখ ম্যাপেও তৃতীয় সক্রিয় জোনে অবস্থান করছে চট্টগ্রাম।

ভুমিকম্প বিষয়ক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৭৬২ সালে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। সাধারণত এক’শ বছর পর একই এলাকায় আবারও বড় আকারের ভূমিকম্প হয়। তবে গত ১৫৮ বছরে প্রার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ব পাশ দিয়ে যাওয়া ফল্টলাইন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বড় ধরনের কোন ভূমিকম্প হয়নি। ফলে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে।