ভালোবাসার স্বাধীনতা

শরণার্থী, নারীবাদ এবং একজন নারী ভ্রমণকারীর গল্প

রূপা দত্ত | শনিবার , ১৪ মে, ২০২২ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত ‘নির্বাক’ সিনেমাটা দেখে বেশ মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভালোবাসা কত রকমের হতে পারে তার কিছুটা পরিচালক তার সিনেমায় দেখিয়েছিল। কেবল মানুষই যে মানুষকে ভালোবাসে তা নয়, একটা গাছ কিংবা ঘরের পোষা প্রাণীটারও আছে ভালোবাসার ক্ষমতা। ভালোবাসার এই ব্যাপকতা তাড়িত করেছিল, নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছিল।

পৃথিবীব্যাপী সমাজের বেঁধে দেয়া নারী পুরুষের সাজপোশাক, চলাফেরার প্রথা ভাঙতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। মেয়েদের পোশাক-পুরুষের পোশাক, মেয়েদের সাজ-পুরুষের সাজ, মেয়েদের কাজ-ছেলেদের কাজ এগুলো যে আলাদা কিছু নয়, সবই সমাজের তৈরি করা কিছু নিয়ম সেটা এখন আমরা কম-বেশি জানি। বৈশ্বিক ভাবনার হাওয়া লাগতে শুরু করেছে আমাদের দেশেও। আবার কে নারী, কে পুরুষ সেই প্রথাগত ভাবনার পরিবর্তনও আমরা গ্রহণ করতে শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ, আমাদের সংবিধানে ‘হিজড়া’ অন্তর্ভুক্তিকরণ। একটা মানুষ নারী বা পুরুষ, সে-পরিচয় নির্ধারণ ব্যাক্তির নিজের উপর। যদিও সামাজিকভাবে এখনও অনেক প্রতিকূলতা আছে এই বিষয়ে, কিন্তু মানুষ জানছে, শিখছে, এটাই পরিবর্তনের প্রথম পর্যায়। পরিবর্তন একদিনে হয় না, পরিবর্তন হয় ধীরে, পরিবর্তন হয় কয়েক প্রজন্ম ধরে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, পৃথিবীর এত এত সমস্যা, এর মধ্যে মানুষের নারী-পুরুষের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে এত কথা বলার কি আছে? এটাকে অনেকে দেখেন বিলাসিতা হিসেবে, অনেকে ভাবেন পাশ্চাত্যের কুপ্রভাব হিসেবে। কিন্তু, সময় আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, মানুষের ব্যক্তিত্ব যদি সঠিকভাবে বিকশিত হতে না পারে, তাহলে সমাজের নৈরাজ্য দূর হবে না। আর ব্যাক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম ধাপ হল, ব্যাক্তির নিজের পরিচয়। ব্যাক্তি যদি তার নিজের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করতে না পারে, তাহলে ব্যক্তিত্ব কীভাবে বিকশিত হবে?

হোস্টেলের আমার রুমমেটদের সাথে আড্ডায় এইসব নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। ইংল্যান্ডের মেয়ে জেনিফারের জন্য আমাদের এই আড্ডায় বসা। খুব আড্ডাবাজ জেনিফার রুমের সবাইকে এক করেছিল আড্ডার টেবিলে। রুমে যারা ছিলাম সবাই মিলে হোস্টেলের সামনের বারান্দায় বসলাম। হাসি-ঠাট্টায় এতগুলো অচেনা মানুষের পরিচয়ের দূরত্ব কখন ঘুচে গেছে কেউ টেরই পেলাম না। জেনিফার প্রস্তাব দিল, সবাই মিলে মেহেদি পরবে। শুনে আমি জানালাম আমার কাছে মেহেদির টিউব আছে, আমি ওদের মেহেদি পরিয়ে দিতে পারি। সবাই হইহই করে রাজি হয়ে গেল। মেহেদি আর গল্পে জমে ক্ষির হয়ে গেল আমাদের আড্ডা। জেনিফারের প্রেমিকের বাবা শ্রীলংকা থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। সেই হিসেবে তার প্রেমিক দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ। কিন্তু, ব্রিটিশ বললে যে সাদা চামড়ার কথা চোখে ভেসে উঠে তা সে না। অভিবাসীর সন্তাানদের পরিচয়ের যে সংকট, তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। জেনিফার বলছিল, প্রথমে ওর পরিবার কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি তাদের খাঁটি ব্রিটিশ রক্তের মেয়ে, একটা কালো এশিয়ানের সাথে প্রেম করছে। অনেক কাঠ-খড় পোড়ানর পর, দুই পরিবার সম্মতি দিয়েছে তাদের সম্পর্ককে।

সেই রোমিও-জুলিয়েট, শিরিন-ফরহাদ, লাইলি-মজনু, দেবদাস-পার্বতী কোন প্রেমই পায়নি পরিবার বা সমাজের সহজ স্বীকৃতি। আমাদের এই একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সমাজে এখনো ছেলে-মেয়েরা খুব কমই পরিবারে বলতে সাহস পায় তাদের প্রেমের কথা। প্রেম যেন এক নিষিদ্ধ সম্পর্ক। এর ফলশ্রুতিতে পরিবারগুলোতে অশান্তি, সমাজে বিশৃঙ্খলা। অথচ, বিষয়টাকে সহজভাবে মেনে নিলে অনেক জটিলতা কমে যেত। কিন্তু, এই আপাত সহজ বিষয়, আমরা আমাদের কিছু গোঁড়ামি দিয়ে সরল অংকের মতো জটিল করে রেখেছি।

আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল ভারতের এক ছেলে। ও ভালোবাসে আরেক ভারতীয় ছেলেকে। কিন্তু সমাজ তো পরের কথা, পরিবারে বলার মতো সাহস তার নাই। তাই সারা বছর টাকা জমিয়ে দু’জন মিলে ঘুরতে চলে আসে থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ড এশিয়ার অন্যতম সমকামী পর্যটক বান্ধব দেশ। এখানে ১৯৫৬ সালে সমকামীতাকে রাষ্ট্র স্বীকার করে নিয়েছে। যদিও, সমকামীদের বিয়ের বিষয়টি আইনী বৈধতা পায়নি এখনো, কিন্তু যুগল হিসেবে একসাথে বসবাস করার স্বীকৃতি রাষ্ট্র দিয়েছে। এশিয়ার মধ্যে তাইওয়ান প্রথম দেশ, যেটি সমকামী বিয়ের বৈধতা দিয়েছে। ব্রিটিশশাসিত দেশগুলোতে ব্রিটিশদের করে যাওয়া আইনের প্রভাব এখনো প্রকটভাবে বিদ্যমান। তাদের শাসনামলে তারা সমকামী বিয়েকে অবৈধ গণ্য করে আইন প্রণয়ন করেছিল সবগুলো দেশে। যদিও থাইল্যান্ড ব্রিটিশদের দখলে কখন যায়নি, তথাপি এর আইনি প্রভাব থেকে বের হতেও পুরোপুরি পারেনি। ইউরোপের অনেক দেশের মত ইংল্যান্ডও সমকামী বিয়েকে স্বীকৃতি দিয়েছে নিকট অতীতে।
২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এলজিবিটি ( লেসবিয়ান, গে, বাই-সেঙুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার) আধিকার ঘোষণা করা হয়। এশিয়ার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ দেশ এই অধিকার প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। তবে পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ এই অধিকারের সাথে সহমত প্রকাশ করেছে। ধর্মীয় এবং প্রচলিত সামাজিক বিশ্বাস বড় ভূমিকা রেখেছে অস্বীকৃতি প্রদানকারী দেশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার এই ঘোষণার বিরোধিতাকারী দেশগুলোর মধ্যে আছে আবার ভারত আধিকারের পক্ষে সম্মতি দিয়েছে।

অষ্ট্রিয়ার মেয়ে হান্নাহ চুপচাপ সব কথা শুনছিল। এক সময় প্রশ্ন করলো, সে লেসবিয়ান, তাহলে কি সে তার প্রেমিকাকে নিয়ে বাংলাদেশে যেতে পারবে না? বলেছিলাম, যেতে পারবে কিন্তু, সম্পর্কের ব্যপারটা প্রকাশ করলে অসুবিধায় পড়ার আশঙ্কা আছে। শুনে খুব মন খারাপ করেছিল। আমি ওকে বলতে পারিনি, নারীপুরুষের প্রেম মেনে নিতেই আমাদের অভিভাবকদের প্রবল আপত্তি, আর সেখানে সমকামী প্রেম মেনে নেয়ার কথা আপাতত ভাবা যায় না। বলতে পারিনি, আমার বাংলাদেশি এক সহকর্মী ২০১৬ সালে ফ্লোরিডার সমকামী বারের হামলাকে সঠিক মনে করেছিল। ওই হামলায় ৪৯ জন ঘটনাস্থলে মারা গিয়েছিল। জাতিসংঘের এত প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতার পরেও যখন তিনি এমন নৃশংস ঘটনাকে সমর্থন করে, তখন ধর্মভীরু আপামর জনসাধারণের কথা না হয় বাদই দিলাম।

তার মানে কি আমাদের সমাজে সমকামী নেই? আছে। আছে বলেই পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায় মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা ছাত্র বলাৎকারের খবর। ধর্ম, পরিবার আর সমাজের চাপে তারা নিজের যৌন পরিচয় লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। আমার এক বন্ধুর খালাকে সারা জীবন সংসার করে যেতে হয়েছে একজন সমকামীর সাথে। পরিবারের চাপে বিয়ে করলেও, এই খালার সাথে ওনার স্বামী কোন শারীরিক সম্পর্ক করেননি। আর লজ্জায় এই কথা কখনও অভিভাবকদের বলতে পারেননি সেই খালা। যৌন চাহিদা বঞ্চিত সেই নারীকে বরঞ্চ নানা গঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল সন্তান হয়নি বলে।

জানি না নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারার জন্য আমাদের দেশে কত ছেলেমেয়ে নিজেকে হত্যা করে, কতজন মিথ্যে সংসার করে, কত মানুষ নীরব ধর্ষণের শিকার হয়। আমরা রাস্তায় দল বেঁধে মানুষ হত্যা করি; খবরে-সিনেমায় হত্যা-নৃশংসতা উপভোগ করি। যুদ্ধের খবরে আমরা যতটা উদ্বিগ্ন হই, তারচেয়ে বেশি হই উত্তেজিত। মানুষে-মানুষে ভালোবাসা আমাদের ভালো লাগে না, আমরা আইন করি ভালোবাসার পথ রুদ্ধ করবার জন্য। ভালোবাসা আমাদের কাছে পাপ।