বয়স যখন টিনএজ- সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ

বাসুদেব খাস্তগীর | বুধবার , ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ

টিনএজ’এ শব্দটি সমাজে আজকাল বেশ প্রচলিত একটি শব্দ। যে শব্দটাকে আমরা প্রমিত বাংলায় কৈশোরকাল বলে থাকি। সে সময়টা হলো শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হবার সন্ধিক্ষণ। সাধারণত বয়স বিবেচনায় ১৩ থেকে ১৯ পর্যন্ত যে সময়কাল সেটাকেই টিনএজ বা কৈশোরকালীন সময় বলা হয়। কেন এটিকে টিনএজ বলা হয় তারও একটি সুন্দর ব্যাখা আছে। ইংরেজি সংখ্যায় ১৩ ১৯ (Thirteen – Nineteen) সংখ্যাগুলোর শেষাংশে ‘teen’ অংশটুকু যুক্ত থাকে। এই ১৩ থেকে ১৯ পর্যন্ত ৭টি সংখ্যায় ‘teen’ থাকার কারণে এই সময়রকালকে ‘টিনএজ’ সময়কাল বলে। প্রত্যেক মানুষের জন্য এই সময়কালটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি হরমোনজনিত ব্যাপারগুলোরও দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এই ৭টি বছর হচ্ছে একজন ব্যক্তির গড়ে ওঠার অত্যন্ত মূল্যবান সময়কাল। এই সময়ের আবেগও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সময়টি এমন সংবেদনশীল সময় যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঘটে যেতে পারে যে কোনো দুর্ঘটনা। এই সময়ে কিশোরকিশোরীদের মনস্তত্ত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টিনএজ সময়ে আবেগ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। নিজের স্বাধীনতা খোঁজা ও নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশে টিনএজ বয়সে আবেগ তীব্রভাবে কাজ করে। কিশোরকিশোরীরা নিজের একটা পরিচিতি খোঁজার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টায় থাকে। এই বয়সে এক সময় মনে হয় নিজের পরিবার পরিজনের চেয়ে সমবয়সী বন্ধুবান্ধবদের সাথে সময় কাটানোটা যেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বয়সের আবেগজনিত কারণে অনেকেই জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নানা ধরনের ভুল পথে পা বাড়ান। এই ভুল অনেকের জীবনের গতিপথ বদলে দেয় এবং সেখান থেকে ফেরার আর কোনো পথ থাকে না। পরিবারের সঠিক তদারকিটা এ সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা বাবা তাঁর সন্তানদের এই সময় সঠিক নজরদারিতে রাখতে না পারলে ঘটে যেতে পারে মহাবিপর্যয়। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সময়টাতে ছেলে মেয়েরা সাধারণত স্কুল কলেজে পড়ে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করে। নানা বন্ধুবান্ধবদের সাথে তাদের পরিচয় ঘটেমেলামেশা হয়। এ সময়টাতে যেমন শিক্ষকদের ভূমিকা আছে, তেমনি ভূমিকা আছে অভিভাবকদেরও। এই সময়কালে তাদের নিজের ভালো মন্দ বুঝার বয়স হয়তো যতটুকু হয়, কিন্তু তার চেয়ে আবেগজনিত কারণে ভুল করে ফেলে বেশি। সেই ভুলের ফাঁদে পড়ে অনেকের শিক্ষা জীবন এমনকি সেই সন্তানের পারিবারিক জীবনও বিপন্ন হয়ে ওঠে। এ রকম উদাহরণ আমাদের চারপাশে হরহামেশা ঘটছেই। কিন্তু একটু সতর্ক হলেই সহজে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। ভুল পথে বা বিপথে যাবার ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ পেতে এখানে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সন্তানদের বন্ধু হিসাবে কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন। সেই সাথে প্রয়োজনে ঘরে ও প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক কাউন্সিলিং। এই বয়সে সন্তানরা কী ধরনের ভুল পথে পা বাড়ায় সে সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। উদ্যোগটা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে হলে ছাত্রছাত্রীরা সচেতন হয়ে উঠতে পারে। পরিবারেও হতে পারে এ রকম উদ্যোগ। এ সময়ে অভিভাবকের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের আচরণ দেখে তাদের শাসক না হয়ে বন্ধু হবার প্রয়োজন এই সময়। একটু খেয়াল করলে দেখবেন এই বয়সের ছেলেমেয়েদের নিয়ে অভিভাবকদের চিন্তার যেন অন্ত নেই। এটা হয়তো কারো কারো ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর হয়তো কারো কারো ক্ষেত্রে তেমন একটা সামনে আসে না। টিনএজ বয়সী ছেলেমেয়েদের শারীরিক নানা পরিবর্তনের পাশাপাশি তার মানসিক ও বিবেক বুদ্ধিরও বিকাশ ঘটে। কিন্তু এ সময়টাতে আবেগের যে প্রভাব থাকে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে নানা ভুল করার প্রবণতা জেঁকে বসে। এই ভুল থেকে যদি তাকে ফেরানো না যায় তাহলে সেটা শুধু নিজের ক্ষতির কারণ নয়, পরিবারের জন্য ডেকে আনে চিরস্থায়ী একটি সংকট। এই বয়সী ছেলেমেয়েদের জীবনযাত্রায় যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয় সেটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অভিভাবকদের কিছু কৌশলী ভূমিকা রাখতে হয়। অনেক নেতিবাচক অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যাবার সময় কিন্তু এটা। জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে গেলে একটা পরিপক্কতার ছাপ থাকতে হয়। আবেগের কারণে অনেকেই এ সময়ে ভুল করে। প্রত্যেক পরিণত মানুষ কিন্তু তার জীবনকালে এই সময়টা পার করে এসেছেন। সফল মানুষের জীবনের নানা ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে দেখবেন ঐ সময়ের আবেগজনিত কোনো সিদ্ধান্ত তাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। সেটা নিজের বুদ্ধিমত্তার কারণে হোক, অভিভাবক কিংবা শিক্ষকের কারণেই হোক। একটি কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার ফলে এই বয়সী ছেলেমেয়েদের আচার আচরণ আমার প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ হয়েছে। অনেক নেতিবাচক ঘটনাকে শিক্ষকদের মোকাবিলা করতে দেখেছি, আবার অভিভাবকদের সাথে বিষয়গুলো শেয়ার করে সমাধানেরও চেষ্টা করা হয়েছে। সবক্ষেত্রে কিন্তু সফল হওয়া যায় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যায়। এটার কারণ অভিভাবকদের অসচেতনতা। একবার আমাদের কলেজে এই সব বিষয় নিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিলিং সভা করা হয়েছিলো। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে এ আয়োজনে একজন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত থেকে এই বয়সী ছেলেমেয়েদের ভুল করার নানা দিক ও উপদেশমূলক কথনগুলো ছাত্রছাত্রীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিলো। সময়ে সময়ে এই ধরনের আয়োজন সকল প্রতিষ্ঠানে হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আজকাল এ ধরনের কোনো আয়োজন প্রতিষ্ঠানে তেমন দেখা যায় না। অভিভাবক হিসাবে এই সময়ে শুধু তার পড়াশুনা না, তার খাবার দাবার, ঘুমসহ শারীরিক পরিবর্তনগুলোর দিকে খেয়াল দিতে হবে এবং তার সাথে এ বিষয়ে বন্ধু হয়ে কথা বলতে হবে। তার নানা সমস্যা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের ব্যাপারগুলোকে শেয়ার করে সমাধানের পথ খুঁজে দিতে হবে। মাদকাসক্ত ও নেশাজাতীয় দ্রব্যগুলোর নেতিবাচক দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে যাতে সন্তানরা এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট না হয়। একসাথে খাবার টেবিলে বসে আনন্দদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে পারিবারিক দূরত্বকে ঘুচিয়ে আনলে অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হয়। যে কোনো সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেয়া খুবই ক্ষতিকর; তার সাথে আচরণটা এমন ভাবে করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যাতে অভিভাবকের সিদ্ধান্তকে সন্তান গুরুত্ব দেয়। কারণ অভিভাবক কখনো তার সন্তানের জন্য খারাপ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এই বোধ তার মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। এই টিনএজ সময়ে সন্তান কীভাবে কী পরিবেশে বড় হচ্ছে সেটার ওপর তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। সুতরাং টিনএজ সময়ে তাকে চোখে চোখে রাখতে হবে। টিনএজ বয়সীরা স্কুল কলেজ পড়ে বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশুনা শুরু করে এবং পড়াশুনাই হচ্ছে তার একমাত্র লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠানে তার শুধু পড়াশুনার দিকে একচ্ছত্র মনোযোগ না দিয়ে তার পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়া জরুরি অভিভাবকদের। সন্তানকে পড়াশুনার পাশাপাশি াটনএজ সময়ে শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির চর্চায়ও আগ্রহী করে তুলতে হবে। আবেগ পরিহার করে জীবনের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে মানসিক শক্তি অর্জন করার প্রেরণা যোগাতে হবে। জীবন গঠনের সোনালি সময়ে জীবন যাতে খাদের কিনারে গিয়ে গতি না হারায় সে দায়িত্ব কিন্তু অভিভাবকদের নিতে হবে। অভিভাবক বলতে শুধু সন্তানদের পিতামাতা না, সেখানে প্রয়োজন ও পরিবেশ পরিস্থিতি অনুয়ায়ী অনেকেই অভিভাবকের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হতে পারেন। টিনএজ সময়কাল জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এখানেই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সন্তানের সুন্দর জীবন জীবনের সবচাইতে দামি সম্পদ। মনে রাখতে হবে অভিভাবকদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই সন্তানের জীবনের সঠিক গতিপথ রচনা করে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক; সহকারী অধ্যাপক, বি এম সি ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ