ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলার জয়

সামনে বৈরি সংসদ ও বিভক্ত দেশের চ্যালেঞ্জ

| মঙ্গলবার , ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ

ব্রাজিলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন বর্ষীয়ান বামপন্থি নেতা লুইস ইনাসিও লুলা ডি সিলভা। তবে পরাজয় মেনে নেননি তার ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো। ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেকটোরাল কোর্ট জানিয়েছে, সব ভোট গণনা শেষে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট। খবর বিডিনিউজের।

বিপরীতে বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট। তবে এই ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলসোনারো। ভোটের সময় অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা বাড়ানোকে ব্যাখ্যাহীন দাবি করে রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি জানান, নির্বাচন বাতিলের জন্য আবেদন করবেন। যদিও ভোটকেন্দ্রগুলো বাড়তি সময় খোলা রাখার জন্য বলসোনারোর প্রচার শিবির এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দল, উভয় পক্ষ থেকেই অনুরোধ জানানো হয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বীর আপত্তির পরও এই ফলকে ঐতিহাসিক বিজয় ও এক অভাবনীয় ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবে উদযাপন করছেন লুলা ও তার সমর্থকরা। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটি লুলার চতুর্থ জয়। এর আগে ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

তবে এবার নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে লুলার সামনে এখন দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ–একটি হল ডানপন্থি দলগুলোর আধিপত্যে ঘেরা বৈরি সংসদ (কংগ্রেস) এবং অন্যটি তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণে বিভক্ত এক দেশ। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তাদের সহযোগী দলগুলো নিম্নকক্ষে ২৮০টিরও বেশি আসন এবং সিনেটে প্রায় ৫০টি আসন পাওয়ার আভাস রয়েছে। উভয় কক্ষেই বোলসোনারো শিবিরের এই সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে লুলার সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি, কর সংস্কার এবং পরিবেশগত নীতিগুলো পাস করানো বেশ কঠিন হবে। তাছাড়া, নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে যে ব্রাজিলের সমাজ ও রাজনীতি বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত। লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯% ভোট এবং ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮.২১% ভোট। সামান্য ব্যবধানেই স্পষ্ট যে, দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ লুলার বামপন্থি মতাদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, রোববারের রান–অফ বা দ্বিতীয় দফার ভোটে জয় নিশ্চিত করার পথটি লুলার জন্য মসৃণ ছিল না। গত ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে লুলার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলসোনারো। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ফল উল্টে দেওয়া সম্ভব নয় বলেই অনেকে ধরে নিয়েছিলেন। প্রথম দফার পরাজয়ের পর বিশাল সব পথসমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ওপর ভর করে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ায় লুলার প্রচারণা শিবির। নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থার সামপ্রতিক উত্থান রুখে দিয়েছেন লুলা।

অঞ্চলটির আর্জেন্টিনা, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো বড় দেশগুলোর নেতৃত্বে এখন ডানপন্থি বা রক্ষণশীল নেতারাই রয়েছেন। ধাতু কারখানার সাবেক শ্রমিক লুলা ১৯৮৯ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর থেকেই ব্রাজিলের বামপন্থার প্রধান মুখ।

তবে এবারের জয়ে তার সামনে ২০০৩ সালে প্রথমবার দায়িত্ব নেওয়ার চেয়েও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি তার নতুন মেয়াদটি শুরু হবে দেশে–বিদেশে নানামুখী বাধার মধ্য দিয়ে, যার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈরিতাও রয়েছে।

কলম্বিয়া ও হন্ডুরাসের নির্বাচনে জয়ী ডানপন্থি প্রার্থীদের সরাসরি সমর্থন দিলেও বলসোনারোকে ট্রাম্প সরাসরি সমর্থন দেননি। তবে ২১ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে ট্রাম্প প্রশাসন একজন ডানপন্থি নেতাকেই নেতৃত্বে দেখতে বেশি পছন্দ করত সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। হোয়াইট হাউজ লাতিন আমেরিকাকে নিজেদের প্রভাববলয় মনে করে এবং প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যসহ নিজস্ব নীতিগুলোকে সমর্থন করে এমন নেতাদের ক্ষমতায় দেখতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। পাশাপাশি এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানোও তাদের মূল লক্ষ্য। তেলসমৃদ্ধ এবং বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল খনিজ সম্পদের মজুত থাকা ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র বৃহৎ দেশ, যার নেতৃত্বে কোনো ডানপন্থি নেতা নেই, যেখানে লুলাকে প্রধানত চীন–ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়।

ফ্লাভিও বলসোনারো ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অন্যদিকে, লুলা যুক্তরাষ্ট্রকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে সাফ জানিয়েছিলেন, ব্রাজিল কখনোই কারও পেছনের উঠোন হয়ে থাকবে না। হোয়াইট হাউজ কিছুটা হতাশ হলেও লুলার বিজয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। বলসোনারো জয়ী হলে ব্রাজিলের প্রভাবশালী কৃষি ও খনি ব্যবসা খাত আরও বেপরোয়া হয়ে উঠত বলে তাদের আশঙ্কা ছিল।

ফ্লাভিওর বাবা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর শাসনামলে আমাজন বনে রেকর্ড পরিমাণ বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। পরিবেশবাদীদের যুক্তি, ফ্লাভিও বলসোনারোর শিথিল পরিবেশনীতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেমে আবারও ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসতে পারত। লুলার সমর্থকেরা জয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও নির্বাচনের ফলে দেখা গেছে দেশ গভীরভাবে বিভক্ত। কারণ, ৪৮ শতাংশের বেশি ভোটার বলসোনারোকে বেছে নিয়েছেন। এই মেরুকরণ হওয়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি লুলাকে দেশ পরিচালনা করতে হবে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থি কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি (পিএল) এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে

এর বিপরীতে দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি বিশাল সব সমাবেশ করে নিজেদের শক্তিশালী তৃণমূল সমর্থনের প্রমাণ দেয়। নির্বাচনের আগে লুলা এই নির্বাচনকে ব্রাজিলের জন্য এক যুগান্তকারী বাঁক বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি শাসনের এক নতুন ধারা চালু করে দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। ভোটের আগে হোয়াটসঅ্যাপের এক লাইভস্ট্রিমে তিনি বলেন, এই দেশ আর কখনওই আগের মতো থাকবে না। নতুন ধারার শাসনব্যবস্থা ঠিক কেমন হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বললেও লুলা জোর দিয়ে জানান, সবার জন্য সমান সুযোগ এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক দেশের লড়াইয়ে অবিচল থাকবেন। তবে বৈরি কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালানো বর্ষীয়ান এই নেতার জন্য আগের তিন মেয়াদের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হতে পারে, কারণ চতুর্থ মেয়াদের শেষে লুলার বয়স দাঁড়াবে ৮৫ বছরে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজনমত জরিপকে ভুয়া বলে নিজের জনপ্রিয়তা ৬০% দাবি করলেন ট্রাম্প
পরবর্তী নিবন্ধশপিংব্যাগে ইয়াবা নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকা,মইজ্জ্যারটেকে গ্রেপ্তার