নতুন গভর্নর ঘোষণা দিয়েছেন ঋণের মূল টাকা একসাথে ফেরত দিলে সুদ মওকুফ এবং ঋণমুক্ত হয়ে বের হয়ে যেতে পারবে। এই ঘোষণায় কিছু টাকা অবশ্যই উদ্ধার হবে এবং কিছু ঋণ গ্রহীতা ঋণের যাতাকল থেকে মুক্তি পাবে। বহু মামলার একাউন্টস্ ঘাটতে গিয়ে দেখলাম, মধ্যবিত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মানে গভীর কাদায় আটকে গেছে। আমার দেখা শতকরা ষাট ভাগ গৃহ, খামারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ছোট শিল্পের ঋণের মূল টাকা আদায় হয়ে গেছে বহু আগে অথচ ঋণটির সুদের দড়ি এখনো গ্রহীতার গলার ফাঁস। খবর নিয়ে দেখুন মূল ১০ লক্ষ টাকা ১২ বছর আগে শোধ হবার পরও এখনো ব্যাংক পায় ১১ লাখ টাকা। এই কাল্পনিক উপাত্তটির মতো গ্রহীতার সংখ্যা লাখে লাখ। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও নিম্ন মাঝারী আকারের অর্থাৎ সর্বোচ্চ ২০/৩০ লাখ টাকা বহু ঋণ গ্রহীতা এবার হয়তো মুক্তি পাবে। তবে মুক্তি পাবার দিন রাতে সন্তানকে বুকে নিয়ে অঝোরে কাঁদবে আর বলবে বাবারে ঋণ শোধ করতে গিয়ে তোর মার সব গহনা আর বাড়ির জমি বিক্রি করে কোন মতে এই একতলা বাড়িটি রক্ষা করেছি।
হলফ করে বলতে পারি কোটি বা শতকোটি বা হাজার কোটি টাকা নিয়ে যারা খেলাপী হয়েছে তারা ফেরৎ দেবে না। অথচ অর্থনীতি এখনো দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংকিং খাতের উপর। ব্যাংকের টাকা নিয়মিত আমদানী রপ্তানী চলছে। গার্মেন্টস্, টেক্সটাইল, খুচরা যন্ত্রপাতি, সিমেন্ট, টাইলস্, সিরামিকসহ শত শত পণ্যের কাঁচামাল আসছে ব্যাংকের মাধ্যমে। ফিনিস্ড গুডের অনেকগুলোই রপ্তানী হয় বিদেশে। এইসব ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ হয়তো নানা কারণে বা অসাধুতায় ঝামেলা সৃষ্টি হয় বা ব্যাংকের টাকা ঝুঁকিতে পড়ে।
অথচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে মেরে দিয়েছে সরকারি হিসেবে এমন সংখ্যা প্রায় ৪০ ভাগ। এই সব খেলাপীরা কয়দিন পর আবদার করবে ১০ ভাগ দিয়ে ঋণ রিসিডিউল করে দেন। আমার সন্দেহ হচ্ছে কিছু দিন পর এই গভর্নর’ই হয়তো বলবেন ২৫ ভাগ দেন এবং সুদের পুরো টাকা মাফ করে দিচ্ছি। বাকী ৭৫ ভাগ মূল টাকাকে ভিত্তি করে ঋণ রিসিডিউল করে দিলাম। এটা ছাড়া খেলাপীদের কাছ থেকে এক টাকাও আসবে না।
এবার গ্রহীতাদের পক্ষ হয়ে বলি। ব্যাংক সঞ্চয়ের উপর সুদ দেয় বছরে ২ বার। অথচ ঋণের উপর সুদ হিসেব করে বছরে ৪ বার। একটা ব্যবসায়ী বহু কারণে বিপর্যয়ে পড়তে পারে। বিপদের সময় ব্যাংক কর্মকর্তারা হয়ে পড়ে একেকজন লাট বাহাদুর। অথচ এই ব্যাংকের মালিকগুলো ঠিকই জানে ১০ কোটির সম্পত্তির মূল্যায়ন ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। রাজনৈতিক বা আত্মীয়তার বিবেচনায় এসব ঋণ মঞ্জুর করা হতো। এই ব্যাংক কর্মকর্তারাই সম্পত্তির ৩ গুণ মূল্যায়ন মেনে নিয়েছিল টাকার বিনিময়ে। এখন এদের কাছে ব্যবসায়ীরা যেন পথের ফকির।
৬টি ইসলামী শরিয়াহ ব্যাংক ক্রাইসিসে পড়েছে একদশক আগ থেকে। ব্যাংকগুলোর ঋণ উদ্ধারের ব্যবস্থা না নিয়ে এক ব্যক্তির হাতে ব্যাংকগুলো দেয়া হয়েছিল অর্থনীতির সমস্ত তত্ত্ব ও নীতিকে উপেক্ষা করে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আমানতকারীদের টাকা সুদাসলে ফেরৎ দেয়া হবে। অবশ্য না দিয়ে উপায়ও নেই। খেলাপীদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে সরকার নীরব। আসলে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। খালি চোখে এক সরকার গেছে আরেক সরকার এসেছে। কার্যত ডিপ এস্টেটের যে গ্রুপ আগের সরকারও দেশ চালাত তারা পরাজিত হয়েছে। ডিপ এস্টেটের অপর গ্রুপ এখন দেশ চালাচ্ছে। ডিপ এস্টেট মানে ধনিক শ্রেণির সব’চে প্রভাবশালী ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। এরা দু’ভাবে বিভক্ত। এরা এদেশে আ.লীগ ও বিএনপি–এর স্টেকহোল্ডার। আমেরিকায় রিপাবলিকান আর ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে। ভারতে কংগ্রেস আর বিজেপি। পাকিস্তানে এরা পি.পি.পি, টিটিপি আর সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় ডিপএস্টেট দেশ পরিচালনা করে।
আমেরিকায় ব্যাংক দেউলিয়া হওয়া নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমেরিকার ফেডারেল ব্যাংক (কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সেটি স্বায়ত্তশাসিত) সরকারকে ব্যাংক পুনরুদ্ধারের টাকা দিতে বাধ্য করে। ওটার নাম বেইল আউট। নীতি, বিংশ শতকের সব’চে জাঁদরেল অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার ‘লর্ড ম্যানার্ড কেইনসের’ বিখ্যাত এই ফর্মূলা ত্রিশের দশকের মন্দা থেকে পুঁজিবাদকে উদ্ধার করেছিলো। বাংলাদেশেও একই নীতি নেয়া হয়েছে। এদেশের ধনীক শ্রেনি প্রথমে রিলিফের গম চুরি করেছে। অত:পর রাষ্ট্রায়ত্ত কল কারখানা চুরি করেছে। অত:পর প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারিকরণের নামে আত্মস্থ করেছে। এরপর গার্মেন্টস্, টেক্সটাইল, খুচরা যন্ত্রাংশ, ভোগ্যপণ্য, সিরামিকসহ শত শত পণ্যের জন্য ব্যাংকগুলোর বোল্টের চাবি তুলে দেয়া হয়েছে ধনিক শ্রেণির হাতে। এরা ডিপস্টেট বুঝে না। লুটপাট বুঝে না। দিনরাত ব্যবসা করে রেমিটেন্স যোদ্ধাদের সাথে এরাই দেশকে এতটুকুতে টেনে তুলেছে। অথচ অর্জনের বেশির ভাগ যারা মেরে দিয়েছে তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পেশাগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ‘অর্থঋণ’ আইনটি একটি শুভংকরের ফাঁকি। প্রকৃত ঋণ খেলাপিদের কান ধরে জেলে ঢুকানোর পদ্ধতি বড়ই দুরূহ। আইনের এই সুযোগ নিয়ে লুটপাটকারীরা অর্থনীতিকে নিয়ে রীতিমতো লুডু খেলায় বসেছে। ভাগ্যিস এদেশের কৃষকরা কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা না থাকলে বহু আগেই এদেশের অর্থনীতি এটম বোমার মতো আওয়াজ করে ফুটে যেতো।
লেখক: অর্থশাস্ত্রের সাবেক প্রভাষক ও আইনজীবী, আপীল বিভাগ।











