পৃথিবী জুড়ে স্বৈরাচারী সরকারগুলো নিজ দেশের সীমানা পাড়ি দিয়ে অন্যদেশেও হামলে পড়ছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন স্বৈরাচারী সরকার কর্তৃক বিরোধীদের হয়রানি ও কণ্ঠরোধ করার জন্য নিজ সীমানার বাইরে হস্তক্ষেপ করার চর্চা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলো কোটি কোটি মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করা থেকে বিরত রেখেছে। বিশ্বের ৭৯ শতাংশ মানুষ এমন দেশ বা অঞ্চলে বাস করে, যেগুলোকে বার্ষিক ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদনে ‘স্বাধীন নয়’ বা ‘আংশিকভাবে স্বাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফ্রিডম হাউস কর্তৃক সমপ্রতি একটি প্রতিবেদনের ফলাফলগুলোর মধ্যে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। বৈশ্বিক অভিশাপ হিসেবে এ বিষয়টিকে সামনে আনা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হলো এক নতুন স্বৈর–রাষ্ট্র চিন্তা। যাতে ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে আরও বেশি স্বৈরশাসক একে অপরের সাথে আঁতাত করা শুরু করেছে। যা নতুন অন্ধকার মোড় বললে বেশি বলা হবে না। প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ৩০টি দেশের জড়িত থাকার মাধ্যমে ১২৬টি আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের ঘটনা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যে দেশগুলো বিদেশে বসবাসকারী ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আন্তঃসীমান্ত গুপ্তহত্যা, অপহরণ এবং ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল বলে দেখানো হয়েছে। প্রধান অপরাধীদের মধ্যে সেই চিরচেনা দেশগুলোই রয়েছে: চীন, রাশিয়া ও ভিয়েতনাম। কিন্তু ফ্রিডম হাউসের নতুন অনুসন্ধানে এই চর্চায় জড়িত দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, বেনিন, জর্জিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়া এবং জিম্বাবুয়েও স্থান করে নিয়েছে। স্বৈরাচারী শাসকদের আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার অধিকাংশ ঘটনার জন্য পূর্ব আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়া অঞ্চলগুলোই দায়ী। একটি কুখ্যাত ঘটনায়–থাইল্যান্ড ৪০ জন উইঘুর মুসলিম পুরুষকে এক দশক ধরে অভিবাসন আটককেন্দ্রে রাখার পর ফেব্রুয়ারিতে জোরপূর্বক চীনে ফেরত পাঠিয়েছে। যদিও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে, দেশে ফিরলে ওই ব্যক্তিরা কারাবাস ও নির্যাতনের শিকার হবেন। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুররা ব্যাপক নজরদারি, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, গণ–আটক এবং আদর্শগত দীক্ষার শিকার হন। ফ্রিডম হাউস নিজ দেশের বাইরে ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক করার ৪৯ টি ঘটনা এবং কর্মীদের ৪৮টি নথিভুক্ত ঘটনা তুলে ধরেছে। এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিরোধী নেতাদের নির্বাসিত করা হচ্ছে, যে আইনগুলো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত। এই মামলাগুলোর মধ্যে ১১ টিতে ফ্রিডম হাউস নিশ্চিত করতে পেরেছে যে, এই পদ্ধতিগুলো ইন্টারপোলের সাথে যুক্ত ছিল। স্বৈরাচারী সরকারগুলো ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করতে এই প্রক্রিয়াটির অপব্যবহার করে আসছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক দমনপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সিংহভাগই নিজ দেশে সন্ত্রাসবাদ বা অন্যান্য “রাষ্ট্রবিরোধী” কার্যকলাপের অভিযোগে অভিযুক্ত। এ প্রথার শিকারদের মধ্যে বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি মানবাধিকার আইনজীবী ও সাংবাদিকরাও রয়েছেন। উইঘুরদের মতোই, এদের অনেককেই শুধুমাত্র তাদের জাতিগত পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। যদিও গণতান্ত্রিক দেশগুলো তাদের দেশে আশ্রয়প্রার্থী ভিন্নমতাবলম্বী ও অন্যান্য কর্মীদের সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বৈরাচারী সরকারগুলো ইন্টারপোল কর্তৃক জারি করা “রেড নোটিস” সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের পুলিশকে একসাথে কাজ করতে সাহায্য করে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মানব পাচার, সাইবার অপরাধ ইত্যাদি মোকাবিলায় ইন্টারপোল কাজ করে থাকে। ফ্রান্সের লিওঁতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধী পুলিশ সংস্থার –একটি রেড নোটিস বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে জানানো হয় যে, কোনো একজন ব্যক্তিকে বিচারের জন্য খোঁজা হচ্ছে। ফ্রিডম হাউস সতর্ক করেছে যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন–বিরোধী মনোভাব এবং নির্বাসন বৃদ্ধি বৈধ রাজনৈতিক শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আন্তর্জাতিক দমনপীড়ন সর্বব্যাপী। এটি প্রতিরোধ করতে হলে মানব স্বাধীনতার প্রতি যত্নশীল দেশগুলোর পক্ষ থেকে আরও সমন্বিত ও সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে। অবৈধ ও বৈধ অভিবাসনের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ আমেরিকার শ্রমিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার সীমান্ত সুরক্ষিত করা এবং অবৈধ অভিবাসীদের, বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর অপরাধ করেছে – তাদের বহিষ্কার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে যে ২২ লক্ষ মানুষ স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হয়েছেন এবং প্রায় ৬ লক্ষ ৭৫ হাজার জনকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অপসারণ করেছে। এদের অধিকাংশই দাগী অপরাধী ছিলেন না, বরং ছিলেন অর্থনৈতিক অভিবাসী।
এদিকে, প্রশাসন বৈধ অভিবাসন বাধাগ্রস্ত করতে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জানুয়ারিতে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করে যে তারা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের গ্রিন কার্ড প্রদান স্থগিত করেছে। এটি ৭৫টি দেশের নাগরিকদের গ্রিন কার্ড দেওয়া স্থগিত করেছিল। নতুন যাচাই–বাছাই পদ্ধতির কারণে কম সংখ্যক ছাত্র ভিসা দেওয়া হবে। এদিকে, কানসাসের গবাদি পশু খামার থেকে শুরু করে লুইজিয়ানার ক্রফিশ শিল্প পর্যন্ত সর্বত্রই কর্মী ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপে জানা যায়–যুক্তরাষ্ট্রে রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোতে ৯ লাখেরও বেশি পদ খালি রয়েছে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক।













