চট্টগ্রামের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা মূলত চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে প্রতিবছর ১২ই বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয়।
এ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা শুরু হবে ২৪ এপ্রিল থেকে। মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা রকম পণ্য নিয়ে এসেছেন ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা। এবার বলী খেলার ১১৭তম আসর। বলী খেলাকে ঘিরে এ বৈশাখী মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকি আমরা চট্টগ্রামবাসী। বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের শতাব্দীপ্রাচীন সর্বজনীন এক লোক উৎসবের নাম। ‘বলী’র আভিধানিক অর্থ পরাক্রমশালী, বীরপুরুষ। বলীদের অতীতে অঞ্চলভেদে ‘মল্ল’ ও ‘মাল’ বলা হতো। এর আভিধানিক অর্থ কুস্তিগির, পালোয়ান। শক্তি, সাহস ও কৌশলই বলীদের কুস্তিতে জেতার প্রধান মন্ত্র। মল্ল’ শব্দটি দেশীয়, মল্লযুদ্ধে যাঁরা অংশ নিতেন, তাঁরা ‘মল্লবীর’ নামে খ্যাতি পেতেন। নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য সে সময় রাজা ও জমিদারেরা কুস্তিগির রাখতেন বেতনের বিনিময়ে। মল্লযুদ্ধই চট্টগ্রামে বলীখেলা নামে সমধিক পরিচিতি পায়। প্রতিবছর চৈত্রের শেষার্ধে আর বৈশাখের প্রথমার্ধে আসে মাসব্যাপী বলীখেলার মৌসুম। সঙ্গে সঙ্গে বসে আনন্দ মেলা, নয়া নয়া পণ্যের হয় আমদানি, চলে হরদম বেচাকেনা। চারদিকে শুনি শুধু বাদ্যধ্বনি আর সানাইয়ের আওয়াজ। ছোটকালে সমবয়সীদের সঙ্গে জুটে সাত–আট মাইল দূরের বলীখেলায়ও চলে যেতাম। এখনও সেই অভ্যাস আছে।
আবদুল জব্বার সওদাগর যে উদ্দেশ্যেই বলীখেলাটি চালু করে থাকুন না কেন, এটি এখন চট্টগ্রাম বৃহত্তম বার্ষিক লোক উৎসব। চট্টগ্রাম কেন বাংলাদেশেও বোধ করি, এত বড় খেলা ও মেলা দ্বিতীয়টি নেই। নগরের আন্দরকিল্লা, বক্সিরহাট, লালদিঘি পাড়, কেসিদে রোড, সিনেমা প্যালেস, শহীদ মিনার সড়ক, কোতোয়ালি মোড়, জেল রোডসহ প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে এ মেলার বিস্তৃতি ঘটে। বলীখেলা ও মেলায় সারা দেশ থেকে রকমারি পণ্যের পসরা নিয়ে হাজির হয় মৃৎশিল্পী, বাঁশ–বেতশিল্পী, কামার–কুমার, কাঠমিস্ত্রি, আসবাব নির্মাতারা। কী থাকে না লালদিঘির মেলায়! জীবনের, সংসারের এমন কোনো প্রয়োজনীয় বস্তু নেই, যা লালদিঘির মেলায় পাওয়া যায় না। আধুনিক, শিক্ষিত গৃহবধূ পর্যন্ত সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন লালদিঘির মেলার জন্য। এ মেলা থেকেই তাঁরা সংগ্রহ করেন সংসারের অতিপ্রয়োজনীয় সব জিনিস ডালা, কুলা, পিঁড়ি, মাথাল, দা, ছুরি, বঁটি, পাটা, ঝাড়ু, হাতপাখা, বাঁশ ও বেতের তৈরি নানা আসবাব। পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য খুব ভোরে ভিড় করেন নারীরা। এ ছাড়া মেলার একটা বিশাল অংশজুড়ে থাকে নার্সারি, বনসাই গাছের প্রদর্শনী। পরিশেষে একটাই বলার আছে, জব্বারের বলীখেলা চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখবে যুগ যুগ ধরে।













