বুভুক্ষু বিষাদ : জীবনের আখ্যান

নাজনীন আমান | সোমবার , ১০ আগস্ট, ২০২৬ at ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ

শত ব্যস্ততার মাঝেও যেটুকু অবসর পাই বই পড়ার চেষ্টা করি। আর তাই গত কদিন ধরে চলমান বৃষ্টির সময়গুলোতে পড়ে ফেললাম ‘বুভুক্ষু বিষাদ’ বইটি। কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক বিচিত্রা সেনের একটি অন্যতম জনপ্রিয়, প্রশংসিত ও ছোটগল্পের সংকলন ‘বুভুক্ষু বিষাদ’। বইটি মূলত মানবমন এবং সমসাময়িক সমাজের ঘটনাবলির এক অনন্য দর্পণ। ২০২৫ সালে রাদিয়া প্রকাশন থেকে বইটি প্রথম আলোর মুখ দেখে। বইটি মূলত একটি সমকালীন গল্পের সংকলন, তবে লেখক বিচিত্রা সেনের অন্যান্য কাজ যেমন ‘পদ্ম পাতার জল’ বা ‘বলাকারা উড়ে যায়’ ইত্যাদির ধারা অনুসারে এটি একটি মননশীল সাহিত্যকর্ম।

বুভুক্ষু’ মানে ক্ষুধার্তএবং বিষাদমানে ‘দুঃখ’ বা ‘মন খারাপ’। এই নামের মাধ্যমে লেখক মানুষের মনের অতৃপ্তি, অপ্রাপ্তি বা কোন গভীর নিঃসঙ্গতাকে বোঝাতে চেয়েছেন। বইটির একটি প্রধান দিক হলো নারী মনের গভীরে প্রবেশ করা। সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীর স্বভাব, আবেগ এবং মনস্তাত্ত্বিক জগৎকে অত্যন্ত রহস্যময় ও জটিল হিসেবে দেখা হয়েছে। লেখিকা তাঁর গল্প গুলোর মাধ্যমে এই বিচিত্র গতি প্রকৃতিকে সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত রূপায়ন দিয়েছেন। মানুষের জীবনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, না বলা বেদনা এবং জীবন সংগ্রামের বিভিন্ন দিকগুলোও এই বইয়ের বিভিন্ন গল্পগুলোতে খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। বইটির নামকরণেই কিন্তু পাঠকেরা এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বা আত্মদর্শনমূলক অতৃপ্তির আভাস পাবে। ‘বুভুক্ষু’ বা ‘ক্ষুধার্ত’ শব্দটির মাধ্যমে লেখক এখানে কেবল শারীরিক ক্ষুধার কথা বলেননি বরং এটি মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা, পরিচিতি এবং অস্তিত্বের ক্ষুধাকে বুঝিয়েছেন। আর বিষাদ হল সেই অতৃপ্তি থেকে জন্ম নেওয়া এক দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপের অনুভূতি। গল্পগুলোর চরিত্ররা প্রত্যেকেই চেনা সমাজের মানুষ, যারা নিজেদের ভেতরে এক ধরনের একাকীত্ব, বেদনা ও শূন্যতাকে বয়ে বেড়ায়।

এটি কেবল কল্পনার গল্প নয়; বরং আমাদের চেনা সমাজেরই এক একটি বাস্তব খণ্ড চিত্র। প্রতিটি ছোট গল্পে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, মানুষের সম্পর্কের টানা পোড়ন এবং প্রাত্যহিক জীবনের সুখ দুঃখের গল্পগুলো ফুটে উঠেছে। একজন দক্ষ কথা শিল্পীর মতো লেখিকা বাস্তব জীবনের নানা অসঙ্গতি ও অনুভূতিকে মলাটবন্দি করেছেন। বইটিতে বিভিন্ন শিরোনামে গল্পগুলোকে সাজানো হয়েছে যেমন ‘অভিসার’, ‘তেয়াগিলে কাছে আসে’, ‘ইউ টার্ন’, ‘বন্ধুত্ব’, ‘ডায়েরির পাতাগুলো’, ‘তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ ‘বিপন্ন বিস্ময়’, ‘রাঙ্গামাটির সেই কটেজে’, ‘হারিয়ে আবার খুঁজি’, ‘আমাদের গয়াযাত্রা’, ‘অন্যরকম শ্রোতা’, ‘কারাতে রন্টি’, ‘বুভুক্ষু বিষাদ’।

এই গ্রন্থের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য গল্প হলো ‘কোথায় যে পাই’। গল্পটিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাবা হারানো ‘অনি’ নামের একটি ছোট্ট মেয়ের মানসিক যন্ত্রণা এবং তার শৈশবের শূন্যতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি কেবল একটা সাধারণ গল্প নয় বরং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক মানবিক ও আবেগময় দলিল। ‘বন্ধুত্ব’ এই বইয়ের আরেকটি গল্প। যেখানে ফুটে উঠেছে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, নিঃস্বার্থ মমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। গল্পে রবিন ও তার প্রিয় কুকুর জিমির মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক তা দেখিয়ে লেখক বন্ধুত্বের আন্তরিকতা, ভালোবাসা এবং বিচ্ছেদের বেদনা তুলে ধরেছেন। ‘বিপন্ন বিস্ময়’ এই গল্পে দেখা যায় তরুণতরুণীর একাকীত্ব, বন্ধুদের দেখে সম্পর্কে জড়ানোর তীব্র ইচ্ছা, দীর্ঘদিনের চ্যাটিং বা ভার্চুয়াল পরিচিতির পর প্রথম বার মুখোমুখি হওয়ার রোমাঞ্চ, অপেক্ষা, মুগ্ধতার অনুভূতি এবং পরিশেষে একটি রহস্যময় ও নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে নীলিমা নামের এক নারীর অতীত ও তার আসল রূপ রবিন নামের তরুণের সামনে উন্মোচিত হওয়া। আর তখন তরুণের দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নয়, ছিল বিপন্ন বিস্ময়। অন্যান্য গল্পগুলোতে মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়ন, সম্পর্কের ভাঙ্গন এবং আধুনিক নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুঃখ কষ্টকে তুলে ধরা হয়েছে।

বুভুক্ষ বিষাদ’ সংকলনের গল্পগুলো বলার শৈলী অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল। গল্পগুলো পড়ার সময় পাঠককে কেবল বিনোদনই দেয় না, বরং প্রতিটি সাধারণ ঘটনার পেছনের গভীর সত্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। জীবনের না বলা বিষাদ বা অতৃপ্তির গল্পগুলো পাঠকের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি ও জীবন বোধের মুখোমুখি দাঁড় করায়। লেখকের নিজস্বতা ও যাদুকরী শৈলীতার জন্য গল্পগুলো পাঠকের মনে সরাসরি দাগ কাটে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা পরিহার করে তিনি চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে সংলাপে ও বর্ণনায় জীবন্ত করে তুলেছেন।

বইটির প্রচ্ছদে ভেতরের ভাব গাম্ভীর্যকে দারুণভাবে ধারণ করেছে। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত সবুজ রঙের বিমূর্ত মানুষের মুখাবয়ব এবং তার চোখের দৃষ্টি মানুষের ভিতরের গূঢ় একাকিত্ব এবং বিষণ্নতাকে নির্দেশ করে। বইটির প্রচ্ছদ একেঁছেন অজয় সেন চৌধুরী। লেখক বইটি উৎসর্গ করেন তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি যাঁদের আলোয় তিনি আলোকিত পথ চিনেছেন। আমি লেখকের উত্তরোত্তর সফলতা ও সুস্থতা কামনা করি। লেখক : প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিনয়বাঁশী জলদাস : শৈশবের স্মৃতিতে দাদু
পরবর্তী নিবন্ধবস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতোটা সহায়ক!