বিরামহীন বৃষ্টি, জলজটে দিনভর দুর্ভোগ

শহরের বহু এলাকা তলিয়ে গেছে পানিতে । আগামী তিন দিনও ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ভূমি ধসের শঙ্কা

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ৯ জুলাই, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

নগরে গতকাল বুধবারও ভারী বর্ষণ হয়েছে। এ নিয়ে একটানা প্রায় চারদিন বিরামহীন বৃষ্টি হয়েছে শহরে। এসময়ে নগরে রেকর্ড হয়েছে ৮৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত এ বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এর সঙ্গে আছে পাহাড়ধসের ঝুঁকি। গতকালও পাহাড় ধসে নগরে প্রাণ হারিয়েছে ১২ বছরের এক শিশু। এছাড়া বর্ষণের সঙ্গে ছিল জলজটেরও দুর্ভোগও। গতকালও শহরের বহু এলাকা তলিয়ে গেছে পানিতে। এদিন অতীতে জলজট হয়নি এমন এলাকায়ও পানি জমে ছিল। গতকাল অবশ্য বৃষ্টি থামার ঘণ্টাখানেকের ভেতর বেশিরভাগ এলাকার পানি নেমে গেছে।

জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়া অফিসের পতেঙ্গা পর্যবেক্ষণাগারে ১৯৪ মিলিমিটার ও আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারে দেশের সর্বোচ্চ ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর আগে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা পর্যবেক্ষণাগারে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার ও ভোর ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ২৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ভোর ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারে রেকর্ড হয় ২৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত এবং একইসময়ে দেশের সর্বোচ্চ ৩১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় বান্দরবানে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ কেন্দ্র জানায়, গত তিন দিনে চট্টগ্রামে ৬৩১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে ‘বাংলাদেশ ওয়েদার অবজার্ভেশন টিম জানায়, গত ৪ দিনে চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গা স্টেশনে সর্বমোট ৮৩৪ মিলিমিটার ও পাহাড়তলীর আমবাগান স্টেশনে সর্বমোট ৭৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে ভারী বৃষ্টির কারণে গতকালও নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলযট সৃষ্টি হয়। কিছু কিছু এলাকার সড়কে ছিল হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। পানি ঢুকে যায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হালিশহর, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, রেয়াজুদ্দিন বাজার, বড় দীঘির পাড়, আগ্রাবাদের বেপারিপাড়া মুহুরীপাড়া, মুরাদপুর, সিএন্ডবি, মনসুরাবাদ, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, চকবাজার, কাপাসগোলা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, সিডিএ আবাসিক এলাকা, জুবিলী রোড, তিন পোলের মাথা, গোয়ালপাড়া, ষোলশহর ফরেস্ট গেট, মৌলভি পুকুর পাড়, ঈদগাঁ, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় গতকালও জলযটের দুর্ভোগ ছিল। নগরের একটি এলাকায় ডুবে যাওয়া সড়কে নৌকা চলাচলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা হয়।

নগরবাসীর জানিয়েছেন, জলযটে তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ হচ্ছে। এছাড়া সিএনজি ও রিকশাচালকের বিরুদ্ধে বৃষ্টির অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন অনেকে।

এদিকে জলাবদ্ধ এলাকা ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। এসময় তিনি বলেন, নালানর্দমা পরিষ্কার করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের কাজ অবকাঠামো উন্নয়ন করা। বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক কারণে সিটি করপোরেশনের পরিবর্তে এ দায়িত্ব সিডিএকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের কাজ পরিচালনার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় জনবল নেই। সে কারণে সেনাবাহিনীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের রেগুলেটর সম্পর্কে বলেন, সব রেগুলেটর বর্তমানে সচল নেই। বুধবার বিকেল থেকেই সেনাবাহিনী এসব রেগুলেটরের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে রেগুলেটর কিংবা পাম্প অচল থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আগামী তিন দিন ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ভূমি ধসের আশংকা : গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ সতর্কবার্তা চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলায় অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ভূমি ধসের সম্ভাবনার কথা জানায়। এতে বলা হয়, ভারতের উত্তরপশ্চিম মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় প্রবল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৯ জুলাই (আজ বৃহষ্পতিবার) থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কঙবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময়ে জেলাগুলোতে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

একই বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৭, , ৯ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড, বাঁশখালী উপজেলা, কঙবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও কঙবাজার সদর উপজেলা, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও বান্দরবান সদর উপজেলা, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলাকে ভূমিধসের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানান, গতকাল বুধবার বিকেল ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে।

এদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত ও চট্টগ্রাম নদী বন্দরের জন্য ২ নম্বর নৌ সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। একইসঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্ব মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে উত্তরপশ্চিম মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিমউত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্বারে দ্বারে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে : মীর হেলাল