সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে ব্যবসা–বাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি সমপ্রসারণে একের পর এক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রথম মতবিনিময় সভায় গৃহীত ২৮টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ২১টি বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স সংস্কার, বন্দরসেবা, করব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ সহজীকরণ ও নতুন শিল্প খাত বিকাশ। অর্থাৎ সংস্কার শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তবায়নের ধাপেও প্রবেশ করেছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সংলাপ শুরু হয়েছে, যা আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করছে। প্রথম ছয় মাসে সরকারের ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি অর্জন ঘিরেই এখন আলোচনা বেশি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৪ দিনের মধ্যে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ, ২৪ ঘণ্টা বন্দর, কাস্টমস ও ব্যাংকিং সেবা, এলসিনির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা, গ্যাসসংকট সমাধানে ডেডিকেটেড এফএসআরইউ, কর ও কাস্টমস সংস্কার, বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ ৫ বছর, নতুন শিল্পে প্রণোদনা, বিদেশি বিনিয়োগ সহজে ই–ভিসা, ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য প্রভৃতি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক পত্রিকান্তরে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্যবসা সহজীকরণ, টাস্কফোর্স গঠন এবং ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক। তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ী সমাজের যোগাযোগ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানও হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি এবং গ্যাস–বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ব্যবসার জন্য সবচেয়ে জরুরি। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী সমাজে আস্থা ফিরে এসেছে। সরকার জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
বাণিজ্য সমপ্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। জনশক্তি অভিবাসন, বাণিজ্য, ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সরকারি–বেসরকারি অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি পৃথক শাখা গঠন করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, সিঙ্গাপুরের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নতুন খাত তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পাট ও পাটজাত পণ্যকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, প্রকৃত মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। কারণ বেশির ভাগ সংস্কার উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নয়ন, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, কর ব্যবস্থাকে আরো সহজ করা এবং মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের রাজস্বব্যবস্থা ও ব্যবসা পরিবেশের উন্নয়ন, করনীতি সহজীকরণ এবং হয়রানিমুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ চান ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেছেন, সকল নীতি সহায়তামূলক করতে হবে, যাতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, মানুষের দুর্দশা কমে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথম ছয় মাসে সরকার ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। ব্যবসায়ী সমাজও সেই প্রচেষ্টাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হলে এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং ধারাবাহিকতা। ব্যবসায়ী নেতাদের ভাষায়, আস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন সময় সেই আস্থাকে বাস্তব ফলে রূপ দেওয়ার।








