আগস্ট মাস এলেই মনটা ঘন ঘোর বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে– পাঁচটি বছর কেটে গেছে, কিন্তু মনে হয় অনন্তকাল যেনো বাবাকে দেখিনি, জড়িয়ে ধরিনি। যেখানে প্রতিদিন বাবার সাথে কথা না বললে দিনটি অপূর্ণ রয়ে যেতো, সেখানে পাঁচটি বছর কীভাবে বাবার আদরমাখা কণ্ঠটি না শুনে জীবনের নিয়মে দিন পার করছি তার উত্তর আমার জানা নেই। বাবা আমার নয়ন সম্মুখে নেই, কিন্তু তাঁর হাজারো স্মৃতি, তাঁর জীবনাদর্শ শাশ্বতই বহন করে চলি। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তা পারিবারিক বা পেশাগত ক্ষেত্রে হোক, নিজেকে আগে প্রশ্ন করি ‘বাবা মা থাকলে কী বলতেন আমায়’। অনেক সময়েই সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো মেলেনা, তবুও স্মৃতি হাতড়ে ভাবি এ পরিস্থিতিতে বাবা কী করতেন।
বাবার আদর্শ আমার কাছে এক অমূল্য উপহার, যা ভাষায় প্রকাশের ঊর্ধে। তবে দুয়েকটি পার্থিব উপহারের কথা আজ বলি– যার মূল্য ছেলেবেলায় ওভাবে বোধগম্য হয়নি। বুঝিনি। বাবার অনুপস্থিতিতে আজ সেই বিশেষ উপহারই আমার কাছে এক গভীর জীবনদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বহু বছর বিদেশে থাকার কারণে একটি অভ্যাস অত্যাবশ্যকীয় বলে মেনে নিতে হয়, তাহলো সময়ানুবর্তিতা। জীবনে যা কিছু নামমাত্র অর্জন–শিক্ষাগত বা নিজ পেশায়, তাঁর সিংহভাগই সময় অপচয় না করে নিজ লক্ষ্যে স্থির থেকে সম্পন্ন করার জন্য সম্ভব হয়েছে বলে মনে করি। সময়ের সাথে এই বোঝাপড়াটা আমার এখন যদিও নিতান্তই স্বভাবজাত মনে হয়, কিন্তু এর পুরো কৃতিত্বটাই বাবাকে দিবো।
বয়স তখন আমার খুবই কম, ৪/৫ বছর হবে বড়ো জোর, কেবল শিশু বিদ্যালয়ে পদার্পণ করেছি। বাবা সেবার জন্মদিনে আমাকে একটি হাতঘড়ি উপহার দিলেন। কী সুন্দর আকাশী নীল ডায়ালের মাঝে কার্টুন আঁকা সেই ঘড়ি পেয়ে উত্তেজনায় আমি স্থির থাকতে পারিনি, কতো জলদি ঘড়ি পড়বো আর স্কুলে গিয়ে সবাইকে দেখাবো, আমার তর সই ছিলোনা মোটেই। কিন্তু বাবা আমাকে প্রথমে ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড এসবের তালিম দিয়ে তারপর হাতঘড়িটি পরিয়ে দিলেন। তখন বুঝিনি এই পার্থিব উপঢৌকনের চেয়ে অনেক অনেক বেশি মূল্যবান ছিলো বাবার কাছ থেকে সময়ের এই গুরুত্বপূর্ণ পাঠটি পাওয়া। বাবা যেকোনো কিছু বুঝাতে শুরু করলে অনেক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতেন, তাই ২৪ ঘণ্টায় একদিন ইত্যাদি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সূর্যের পরিক্রমা, দিবারাত্রির চক্র এসবও খেলাছলে মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন। বাবার মুখে শোনা সময়ের এই ভৌগোলিক এবং বৈজ্ঞানিক বিবরণ আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতন আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো কয়েকটি দিন। মনে হয়েছিলো এই সময়টা আমার হাতের মুঠোয় থাকাটা অর্থাৎ সময়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারাটা যেনো একটি সুপারপাওয়ার! হাতঘড়িটি এরপর থেকে হয়ে গেলো আমার নিত্যসঙ্গী, রোজ স্কুলে তো পরে যেতামই, এমনকী খেলার মাঠে বা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময়ে হাতে পরা থাকতো আমার প্রিয় এই ঘড়িটি। সময়ের ছকে মেপে মেপে হোমওয়ার্ক করা, ঘুমানো সবই যেনো সহজাত মনে হতো, নিজের অজান্তেই মনের গভীরে ঘড়ির কাঁটা ধরে সবকাজ করাটা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। আমার কখনো মনে পড়ে না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে দেরি করে উপস্থিত হয়েছি, আর তার জন্য ছোটকালে বাবার দেওয়া অমূল্য উপহারটির অবদানই সবচেয়ে বেশি। কর্মক্ষেত্রেও যথাসম্ভব সময় মেনে চলার চেষ্টা করি, বিদেশের কর্ম সংস্কৃতিতে এটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমার কাছে সময়ানুবর্তিতা কখনো চাপ কিংবা উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠেনি। খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের অজান্তে সময়কে শ্রদ্ধা করে দৈনন্দিন পথচলা। ছোটকালে অবচেতন মনে একটি অদৃশ্য ঘড়ি যেনো বাবা প্রোথিত করে দিয়েছিলেন তাইতো সে ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ যেনো হৃৎস্পন্দনের সাথে একই তালে বাজে। আর সেইসাথে প্রতিটি মুহূর্তে বাবাকে স্মরণ করে অসীম কৃতজ্ঞতায় মন সিক্ত হয়ে উঠে।
সময়ের সাথে সাথে হাতঘড়িও বদল হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে নতুন ডিজাইনের, ,বিভিন্ন মডেলের ঘড়ি ব্যবহার করেছি, কিন্তু ছোটবেলার সেই আকাশি–নীল হাত ঘড়িটির মতো প্রিয় আর কোনো ঘড়ি কখনো হয়ে ওঠেনি। কারণ সেটি শুধু একটি ঘড়ি ছিল না, সেটি ছিল বাবার ভালোবাসা, তাঁর শিক্ষা, তাঁর দূরদৃষ্টি এবং তাঁর নীরব আশীর্বাদের প্রতীক।
বাবাকে এ কথাটি বলবো বলবো করেও বলা হয়ে উঠেনি. না বলা হাজারো কথার মাঝে এটিও অনুচ্চারিত রয়ে গেলো –সময় মতন অনেক কিছুই সম্পন্ন করতে পারলেও বাবাকে ‘থ্যাংক্যুবাবা’ বলতে পাঁচটি বছর দেরি হয়ে গেলো,
সময়ের এই নির্মম খেলায় পরাজয় মেনে নিয়েই আজ শুধু একটি কথাই বলতে চাই –
‘সরি বাবা। আর ধন্যবাদ। তুমি আমাকে শুধু একটি হাতঘড়ি দাওনি, সময়কে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলে। সেই শিক্ষাই আজও আমার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য উপহার।’
লেখক: ড. সনিয়া কাদেরী, এমএসসি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), পিএইচডি (ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস, অস্টিন), মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর ও ফোটোনিক্স প্রতিষ্ঠান কোহেরেন্ট কর্পোরেশনের সিনিয়র প্রিন্সিপাল ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার।












