ক’মাস হয়ে গেছে বাবলু মা বাবার সাথে এই গ্রামের বাড়িতে পড়ে আছে। সেই কবে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা যুদ্ধ চলছেই। তাদের শহরের বাসার চারপাশের লোকজনও কোথায় কোথায় যেন চলে গেছে। কেউ কারো সাথে কথা বলার ফুসরত পায়নি। কোন পরামর্শ করতে পারেনি। সবাই শহর ছেড়েছে।
মা বাবার সাথে বাবলু ও দোলা এসে পড়েছে গ্রামের বাড়িতে। গ্রামেও সবার মন খারাপ। স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সবার চোখে মুখে ভীষণ চিন্তার ছাপ, ছোট হলেও বুঝতে পারে বাবলা। এখন তারা কি করবে বুঝে উঠতে পারে না।
বাবলু মা’র কাছে ঘুর ঘুর করে। পাড়ার ছেলে টুবলু, আশু,জীবন সবাই এসে বাবলাকে ডাকা ডাকি করে বিলের ওদিকে খেলতে। বাবলু’র ইচ্ছে হয় না। সেই হৈ চৈ এ যেতে। বাবলু’র মন খারাপ পাকিস্তানিদের সাথে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা যদি গ্রামে ঢুকে পড়ে। পাকিস্তানিদের কাণ্ড দেখে মন ঘৃণায় ভরে ওঠে। কি করেছে তারা–বাঙালিরা। পাকিস্তানিরা তাদের ইচ্ছেমতো শাসন করবে। বাবা কাকাদের কথাবার্তা হতে বাবলু বেশ বুঝেছে–হারামজাদা পাকিস্তানিরা বাঙালিদের দুচোখে দেখতে পারে না। চলতে ফিরতে শুধু হিংসা করে। তাদের দাস মনে করে। দেশের সব বড়ো বড়ো অফিসাররা নাকি পশ্চিম পাকিস্তানি। সেখানে বাঙালিরা নাম মাত্র ছোট ছোট পদে কাজ করছে। কথায় কথায় নাকি তারা বাঙালিদের দিকে চোখ রাঙায়।
গ্রামে এসে বাবলু সুশান্ত কাকাদের বলাবলিতে শুনেছে পাকিস্তানি সৈন্যর ভয়ঙ্কর, নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার, নির্যাতনের কথা। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের তাবেদার রাজাকার আলবদর আলশামসদের নিয়ে গ্রামে শহরে ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে। চারদিকে ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কেউ বাঁচতে পারছে না তাদের নিষ্ঠুরতা থেকে। পাকিস্তানি সৈন্যদের হামলার পাশাপাশি রয়েছে তাদের দোসরদের বাঙালিদের বাড়ি ঘর লুটপাট। বাবলা সব শুনেছে দাদু, বাবা, কাকারা বাড়িতে সব ফিসফাস করে বলছে,কোথায় কোথায় মুক্তি সেনাদের ক্যাম্প হয়েছে। সেই বাঁশখালীর পাহাড়ি অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং চলছে।
এই গ্রামের অনেকে নাকি যুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে। তারা যুদ্ধে যাবে। পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করবে। বাবলু অতসব নিয়ে মা’র সাথে কথা বলে। মা’র মুখ ভার। ‘বাবলু মন খারাপ করবে না। দেখো না কি হয়? দেখো মুক্তিবাহিনী ঠিকই যুদ্ধে জিতবে।’ বাবলু সহজে বুঝতে চায় না। নানান প্রশ্ন করে বসে মাকে। মা–যুদ্ধ কি? ওরা আমাদের তাড়িয়ে দেবে? বাবলু’র কথা শুনে মা আঁচল ঢেকে ফুঁফিয়ে কাঁদে–। মা আমিও কাকাদের সাথে যুদ্ধের ট্রেনিংএ যাবো,যুদ্ধে যাবো। মা জড়িয়ে ধরে বাবলুকে বাবা বেঁচে থাকো। পাকিস্তানিরা যদি জানতে পারে তাহলে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ হবে বৈকি! বাবা বলে–কোথাও যাবে না বাপু। দেশে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সাবধানে থাকো কিছুদিন।
বাবলুও বোঝে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের বর্বরতা। তারা বাঙালি শেষ করে দিতে চায়। তাদের এদেশকে নিজেদের গোলাম করে রাখতে চায়। বাবলু এতো সব সব শুনেছে বাবার কাছ হতে,কাকাদের কাছ হতে। মুক্তিবাহিনী চারদিকে জোর লড়াই করছে,তারা জিতবেই হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে।
বাবলু দেখে দেশে সবাই জোর শলা পরামর্শ করছে,মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য নানা উপায় বের করছে। পাকিস্তানি সৈন্য তাদের দালালদের রুখতে সবাই একজোট হচ্ছে। অতসব শুনতে শুনতে বাবলু’র মন খুশিতে ভরে উঠে। বাবলু বিশ্বাস করে ঠিকই মুক্তিবাহিনী হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যকে হারিয়ে দেবেই। তাদের দেশ স্বাধীন হবে। সেখানে বাঙালিরা বুক ফুলিয়ে বসবাস করবে। প্রাণ ভরে নি:শ্বাস নেবে তাদের সোনালী স্বদেশে। তাতে থাকবে না কারো ভয় ভীতি। কারো চোখ রাঙানি। বিদেয় হবে হায়েনা পাকিস্থানি দস্যুরা। তারা সবাই মিলে মিশে বসবাস করতে পারবে। তাদের আর ছোট হয়ে থাকতে হবে না। কারো গোলামি করতে হবে না।
তাদের বাংলাদেশ একদিন ঠিকই স্বাধীন হবেই। তারা হারিয়ে দেবে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে। তারা ফিরে পাবে সোনালী স্বাধীন বাংলাদেশ।











