বাগদাদে শায়িত বড় পীরের নীতি-নৈতিকতা

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ

১১ রবিউস সানি পীরানে পীর বড় পীর হযরত শেখ আবদুল কাদের জিলানীর ওফাত বার্ষিকী। বাগদাদ নগরীতে এ মহান বড় পীর শায়িত। তিনি ইরানের জিলান প্রদেশের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর বাবা–মা জিলান প্রদেশেই শায়িত আছেন।

হযরত বড় পীর যৌবনের প্রারম্ভে জ্ঞানার্জনের জন্য বাগদাদে যান। এর কিছুদিনের ব্যবধানে বাগদাদে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। হযরত শেখ জিলানীও তখন অনাহারে–অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন। ইসলাম ধর্মমতে কারও কাছে কিছু চাওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা আছে; যা কিছু চাওয়ার তা কেবল মহান আল্লাহ তাআলার কাছেই চাইতে হবে।

তিনি এমন চরম অনাহারে–অর্ধাহারে ছিলেন যে, রাস্তার ধারে ডাস্টবিনে উচ্ছিষ্ট খাবার ভিক্ষুকদের পাশাপাশি তিনিও তালাশ করেছেন। পরবর্তীতে জিলান থেকে তাঁর মায়ের পাঠানো কিছু স্বর্ণমুদ্রা অলৌকিকভাবে তাঁর কাছে পৌঁছায়। মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে জ্ঞান অর্জন করে তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছান যে, তৎকালীন লাখো মানুষ তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত।

তিনি দীর্ঘ ৭৩ বছর বাগদাদে কাটান এবং একটি নির্ধারিত স্থানে মানুষকে নসিহত বা ওয়াজ করতেন। সে সময়ও হাজার হাজার মানুষ তাঁর নসিহত শোনার জন্য উপস্থিত হতো। তাঁর মাহফিলে খলিফা, নাজির, মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত হতেন। তিনি যেমন একদিকে মহান আলেমে দ্বীন ছিলেন, তেমনি অন্যদিকে তরিকত, সুফিবাদ ও তাসাউফের অনুসারী ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় পরপর ৫ জন খলিফা বাগদাদে বসে মুসলিম জাহান শাসন করে গেছেন। প্রত্যেক খলিফারই আগ্রহ থাকত যেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) তাঁদের রাজদরবারে তশরিফ নেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। কিন্তু তিনি তা কখনো করেননি। খলিফার উজির ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হয়তো কোনো খলিফার বার্তা নিয়ে এই পীরানে পীরের বাড়িতে আসতেন। স্বভাবসুলভভাবেই তিনি প্রবেশের মূল দরজা খোলা রেখে অন্দরমহলে চলে যেতেন। খলিফার উজির বা প্রতিনিধি সামনের ঘরে বসলে, হযরত বড় পীর অন্দরমহল থেকে আসতেন। এরপর দাঁড়িয়ে সালাম বিনিময় করাটাই ছিল স্বাভাবিক। অর্থাৎ, হযরত পীরানে পীর বড় পীর দুনিয়ার কোনো রাজা–বাদশাহ, মন্ত্রী, আমলা কিংবা জাগতিকভাবে সম্মানিত কাউকে আলাদা কোনো মূল্যায়ন করতেন না। উল্টো তিনি ঘরের লোকজনের কাজ করে দিতেন, কাপড় ধুয়ে দিতেন এবং গরিবদের খেদমত করতেন।

পীরানে পীর বড় পীরের এত বেশি কারামত রয়েছে যে, তা শুনলে শরীর শিউরে ওঠে। তাঁর এই বিশাল কারামতের ভান্ডার নিয়ে বিশ্বের কারও কোনো দ্বিমত নেই। আহলে হাদিস তথা সালাফি মতাদর্শের ইমাম ইবনে তাইমিয়াও স্বীকার করেছেন যে, পীরানে পীরের কারামতের ভান্ডার চিরন্তন সত্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা যারা তরিকত ও তাসাউফের অনুসারী, তারা যৌবনকাল থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত কেবল তাঁর বিশাল কারামতের ভান্ডারের বিষয়টুকুই জেনে এসেছি।

পীরানে পীর যে একজন পরম নীতিবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং দুনিয়ার মোহ থেকে বহুদূরে অবস্থান করেছেন–তা আমরা কজন জানি! তিনি রাজা–বাদশাহ, মন্ত্রী ও আমলাদের ন্যূনতম মূল্যায়ন করেননি; বরং আল্লাহর রাসুল (স.) ও মহান আমিরুল মুমিনের নীতি বুকে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন। হযরত পীরানে পীর ক্ষুধার্তকে অন্ন জোগাতে এবং অভাবী মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অকাতরে টাকা খরচ করতেন। এতেই তিনি পরম আনন্দ পেতেন।

আল্লামা ইবনুল নাজ্জার হযরত বড় পীর থেকে বর্ণনা করেন-“গোটা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদও যদি আমার হাতে চলে আসে, তবে আমি তার পুরোটাই ক্ষুধার্তদের মাঝে বিলিয়ে দেব।” পীরানে পীর আরও বলতেন-“মনে হয় আমার হাতে কোনো ছিদ্র আছে, তাই কিছুই আমার কাছে জমা থাকে না। যদি হাজার দিনারও (স্বর্ণমুদ্রা) আমার হাতে আসে, তবে দেখা যাবে রাত পোহানোর আগেই তা শেষ হয়ে গেছে।“

‘কালাইদুল জাওয়াহির‘ গ্রন্থের রচয়িতা লিখেছেন–পীরানে পীরের নির্দেশ ছিল, রাতের বেলা যেন একটি প্রশস্ত দস্তরখান বিছানো হয়। তিনি নিজে মেহমানদের সঙ্গে বসে খাবার খেতেন, গরিব ও অসহায় মানুষদের সঙ্গ দিতেন এবং ছাত্রদের প্রশ্নসমূহ অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শুনতেন।

ইমাম হাফিজ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আল–বায়জাবী আল–আশবেলী পীরানে পীরের প্রশংসায় বলেন, তিনি যে দোয়া করতেন তা–ই কবুল হতো। অর্থাৎ তিনি ছিলেন ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াত‘ (যার দোয়া কবুল হয়)। তিনি সবসময় আল্লাহর জিকির ও ফিকিরে মগ্ন থাকতেন। তাঁর অন্তঃকরণ ছিল খুবই কোমল। তিনি ছিলেন পরম উদার, দানশীল এবং ব্যাপক ও বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী। উচ্চ বংশজাত এই মনীষী ইবাদত–বন্দেগি ও রিয়াজত–মুজাহাদার ক্ষেত্রে ছিলেন অনন্য।

হযরত শেখ বড় পীর জাহেরি ও বাতেনি জ্ঞানে পূর্ণতা লাভের পর শিক্ষা, সংস্কার ও সংশোধনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। একই সঙ্গে তিনি দরস (শিক্ষাদান) এবং ধর্মীয় উপদেশমূলক কাজের প্রতি মনোযোগী হন। স্বীয় উস্তাদ শেখ মাখরামীর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও নিয়মিত ওয়াজ করা শুরু করেন। এর ফলে দ্রুতই এই মাদ্রাসাটি সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরবর্তীতে শেখের ভক্ত–অনুরক্তরা মাদ্রাসা গৃহের বিশাল সম্প্রসারণ করে তা হযরত পীরানে পীরের মজলিসের উপযোগী করে তোলেন।

তাঁর ওয়াজ শুনতে গোটা বাগদাদ শহর যেন বাদ ভাঙা ঢল নামত। মহান আল্লাহ তাআলা হযরত শেখকে এমন প্রভাবমণ্ডিত ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা দান করেছিলেন, যা বড় বড় রাজা–বাদশাহদের ভাগ্যেও জুটত না।

হযরত শেখ মুফিক উদ্দিন ইবনে কুদামা বলেন, “কেবল ধর্মের কারণে তাঁর চেয়ে বেশি সম্মানের অধিকারী হতে আর কাউকে দেখিনি। খলিফা তথা বাদশাহ এবং উজির তথা মন্ত্রীবর্গ তাঁর মজলিসে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে হাজির হতেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উপবেশন করতেন।“

সেখানে উপস্থিত উলামা ও ফকিহদের সংখ্যা নিরূপণ করা ছিল এক দুরুহ ব্যাপার। একেকটি মজলিসে চার–চারশত দোয়াত (কলম দিয়ে লেখার জন্য কালির পাত্র) দেখা যেত। এগুলো মানুষ তাঁর পবিত্র মুখ থেকে নিঃসৃত বাণী লিপিবদ্ধ করার জন্য নিয়ে আসত।

মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর কলবের তাওয়াজ্জু ও মুখের তাসিরে লাখো মানুষকে ঈমানি জিন্দেগি দান করেছেন। তাঁর অস্তিত্ব ছিল ইসলামের বসন্ত সমীরণের মতো, যা মৃত দিলের (অন্তর) মাঝে নতুন প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করত। তিনি মুসলিম জাহানে ঈমান ও আধ্যাত্মিকতার এক নতুন জোয়ার বইয়ে দিয়েছিলেন।

হযরত শেখ ওমর কিসানী বলেন, “হযরত শেখের এমন কোনো মজলিস বসত না, যেখানে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কেউ না কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত না। এমনকি ডাকাত, খুনি ও নানাবিধ পাপে লিপ্ত মানুষও সেখানে তওবা করার সৌভাগ্য লাভ করত। ভ্রান্ত আকিদা–বিশ্বাসের লোকেরা তাদের ভুল পথ থেকে ফিরে এসে তওবা করত।“

হযরত জুব্বাই বর্ণনা করেন–একবার হযরত শেখ আমাকে বললেন, “আমার মন চায় আগের যুগের মতো মাঠে–ময়দানে ও জঙ্গলে গিয়ে অবস্থান করি। আল্লাহর কোনো মাখলুক যেন আমাকে না দেখে এবং আমিও যেন কাউকে না দেখি।” কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কল্যাণ চান। হযরত শেখের হাতে ৫ হাজারেরও বেশি ইহুদি ও খ্রিস্টান মুসলমান হয়েছেন। এছাড়া ধূর্ত ও পেশাদার পাপীদের মধ্য থেকে লাখেরও বেশি মানুষ তওবা করেছেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, বাগদাদে বসবাসকারীদের একটি বড় অংশ হযরত শেখের হাতে হাত রেখে তওবা করেছিলেন এবং বিরাট সংখ্যক ইহুদি ও খ্রিস্টান ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। হযরত শেখ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) দীর্ঘ ৭৩ বছর বাগদাদে অতিবাহিত করেন। এই সময়ের মধ্যে ৫ জন আব্বাসীয় খলিফা তাঁর চোখের সামনে একের পর এক খেলাফতের আসনে সমাসীন হন। এই মহান পীরানে পীর বড় পীর ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানি ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

১৯৯৭ সালে ইরাকে কঠোর অবরোধের সময় জেদ্দা থেকে জর্ডানের রাজধানী আম্মান হয়ে সড়কপথে সপ্তাহখানিকের জন্য ইরাক গমনের সুযোগ হয়েছিল। রাজধানী বাগদাদে হযরত শেখের মাজার কমপ্লেক্সের কিছুটা দূরত্বেই একটি হোটেলে আমরা ১৮ জন সপ্তাহখানিকের জন্য অবস্থান নিই। ফলে বারবার হযরত শেখ পীরানে পীরের মাজার যেয়ারত করার সৌভাগ্য হয়েছিল।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধঐতিহ্য-সন্ধানী নিরলস সাধক-আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ
পরবর্তী নিবন্ধবোধনের ‘লেখাপড়া’