
জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং প্রথিতযশা আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদিউল আলমকে। তিনি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন চন্দনাইশ থানার ফতেনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জলিলুর রহমান ও মাতা শরীফুন্নেছা। বদিউল আলম পিতা–মাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর কনিষ্ঠ তিন সহোদরের নাম রুহুল আমিন, সিদ্দিক আহমদ ও নুরুল আমিন। একমাত্র বোন চেমন খাতুন।
তিনি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম শহরের ওপর ঘন ঘন জাপানি বোমা হামলার মুখে আইএ পরীক্ষার কেন্দ্র কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে স্থানান্তরিত হলে সেখান থেকে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এ বছর যারা বিএ পাস করেন তারাই ছিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাবেক পূর্ববঙ্গের সর্বশেষ গ্র্যাজুয়েট। কারণ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ পাকিস্তান ও ভারত দু’টি দেশে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এরপর স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রাম কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ হয়ে পড়েছিল।
পারিবারিক কারণে তাঁর স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পড়া সম্ভব হয়নি। সেসময় তাঁদের পরিবার আর্থিক সংকটে ছিলো, বড় ছেলে হিসেবে তাঁকে পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য উপার্জনের পথ ধরতে হয়েছিলো। জীবিকা হিসেবে প্রথমে চাক্তাইয়ে মামাতো ভাইদের সঙ্গে শেয়ারে চালের পাইকারি ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু অংশীদারদের মধ্যে মতানৈক্যের কারণে যৌথ ব্যবসা ভেঙে যায়। ব্যবসায়ী সুলভ বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার অভাবে বিশেষ করে তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে ঠকান। ফলে দু’দুবার তিনি নিঃস্ব হয়ে যান। ব্যবসায় মার খেয়ে এবার চাকরির সন্ধান করলেন। সেসময় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আবগারি ও শুল্ক বিভাগে পরিদর্শক পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন এবং ইন্টারভিউতে পাস করে নিয়োগপত্রও পান। প্রথম পোস্টিং পান বরিশালে, পদমর্যাদা পরিদর্শকের। বরিশালে মাস খানেক কাজ করার পর বদলির আদেশ পান ভোলায়। ভোলায় দু’তিন মাস কাজ করার পর তাকে যশোর জেলার বেনাপোল স্থল–শুল্ক ফাঁড়িতে বদলি করা হয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তিনি আনোয়ারা থানার পিরখাইন গ্রামের সিকদার পরিবারে বিয়ে করেন। সাবেক এমপিএ আকতার কামাল চৌধুরীর বোন ছিল কনে। বেনাপোলে কাজ করার সময় তাঁর খালু শ্বশুর সাবেক জেলা জজ গোলাম রহমান চৌধুরী তাঁকে বলেছিলেন চাকরি ছেড়ে ল’ পড়ে আইন ব্যবসায় যোগ দেয়ার জন্য। তাঁর আশংকা ছিল শুল্ক বিভাগের চাকরিতে চরিত্র ঠিক রাখা যাবে না। খালু শ্বশুরের উপদেশ মাথায় পেতে নিয়ে কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে যান। আইন পড়ার সময় ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কাশেম ও আকতার কামাল চৌধুরীর পক্ষে পটিয়া, আনোয়ারা ও বোয়ালখালীতে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। এই নির্বাচন তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে আসে।
অ্যাডভোকেট বদিউল আলম ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বারে যোগদান করেন এবং অচিরেই একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। আইন পেশায় তিনি প্রভুত সুনাম ও খ্যাতির অধিকারি হন। তিনি ষাটের দশকে সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটার নিযুক্ত হন। আইনজীবীদের পেশাগত সংগঠন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সহ–সভাপতি (১৯৭২) ও সভাপতি’র (১৯৮১) পদ অলংকৃত করেছিলেন। দীর্ঘ ৫ দশকের আইন পেশায় তাঁর অধীনে শতাধিক আইনজীবী জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন, যাঁরা বর্তমানে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট এবং চট্টগ্রাম বারে সাফল্যের সাথে কর্মরত আছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পলে বছরাধিককাল বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেন।
অ্যাডভোকেট বদিউল আলম ষাটের দশকে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বিডি মেম্বার ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পটিয়া থানা উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে পটিয়ার উন্নয়নে অবদান রাখেন।
তিনি একজন ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি (১০ বছর), সহ–সভাপতি ও পটিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহযোগিতা করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন বিশিষ্ট সংগঠক ছিলেন। আইয়ুবের আমলে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনা করে তিনি সুখ্যাত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ নামে একটি নতুন দল গঠিত হলে তিনি নবগঠিত এই দলে যোগদান করেন। তিনি জাসদের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। জাসদের প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে পটিয়া থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
অ্যাডভোকেট বদিউল আলম কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানার দীর্ঘ ১০ বছর গভর্নিং বডি এবং পটিয়া কলেজ অর্গানাইজিং কমিটি ও অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সমাজকল্যাণ সংস্থারও তিনি আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি লইয়ার্স কাউন্সিল, বাংলাদেশ সলিডারিটি কাউন্সিল চট্টগ্রাম, মুসলিম জুরিস্ট ও লইয়ার্স ফোরাম নামক সংগঠনের আহ্বায়ক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি নিজ গ্রামে শরীফুন্নেছা–নজিরউদ্দিন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং একটি প্রাইমারি স্কুল, একটি মাদ্রাসা ও তৎসংলগ্ন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন।
বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাঁর এক ডজনেরও অধিক প্রকাশিত পুস্তক–পুস্তিকা রয়েছে। মানবকল্যাণই তাঁর কাছে সমধিক গুরুত্ববহ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ : আইন ও সমকালীন প্রসঙ্গ, দেশ হতে দেশান্তরে (ভারত), দেশ হতে দেশান্তরে (ব্রিটেন ও সৌদি আরব), কত স্মৃতি কত কথা, যৌতুক : একটি সামাজিক অভিশাপ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ, রাজনীতির সেকাল একাল–প্রসঙ্গ : বাংলাদেশ, যা কিছু মনে আছে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও আজকের মুসলিম সমাজ, সামপ্রতিক ভাবনা, বাংলাদেশ: জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদ, উপমহাদেশ বিভক্তি ও আজকের বাংলাদেশ, রক্তের আখরে লেখা বালাকোট, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি?, ফ্যাসাদ ফেতনা চেতনা নয় আত্মপ্রতারণা, বাংলাদেশে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ, জয় না জিন্দাবাদ। প্রকাশিতব্য : বদিউল আলম রচনাবলী (৩ খণ্ডে)।
তিনি এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সম্মানে আইনজীবীবৃন্দ এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন।
ইতিহাস সচেতন বদিউল আলম তাঁর জন্মস্থানের ইতিহাস উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন। ‘যা কিছু মনে আছে’ নামে আত্মজীবনীতে (প্রকাশ সেপ্টেম্বর ১৯৯০) তিনি লিখেছেন এভাবে : “পিতা আমার মেহনতি লোকদের একজন ছিলেন। নাম জলিলুর রহমান, কোন কোন কাগজ পত্রে জলিল বক্স লেখা আছে। দাদার নাম ওবেদুল্লাহ। উনার ৪ ছেলে– আবদুর রহমান শিকদার, খলিলুর রহমান, জলিলুর রহমান, আমজু মিয়া। পিতা লেখাপড়া তেমন জানতেন না। খুব স্বাস্থ্যবান শ্যামবর্ণের সুন্দর পুরুষ ছিলেন তিনি। আমার সৎমা এক কন্যা সন্তান রেখে মারা যাবার পর পার্শ্ববর্তী জোয়ারা গ্রামের পেশকার বাড়ির আজগর আলী পেশকার ছাহেবের একমাত্র কন্যা আমার মাতা শরীফুন্নেছাকে বিবাহ করেন। আব্বার এই সংসারে আমরা চার ভাই এক বোন ছিলাম।… মা একান্নবর্তী পরিবারের কাজে খুবই খাটতেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত আমার বাবা–চাচা–জেঠার ওয়ারিশেরা একান্নবর্তী পরিবারে ছিলেন। আমরা চার ভ্রাতা এক বোন। দুই জেঠা ও এক চাচা প্রত্যেকে এক একজন পুত্র সন্তান রেখে মারা যান। আমার শৈশবে বড় জেঠা আবদুর রহমান শিকদারই জীবিত ছিলেন।
আমাদের পূর্বপুরুষ শিকদার ছাহেব নাকি বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। বিলের মাঝে নতুন বাড়ি করে নেবার পর তিনি পূর্ব দিকের গ্রাম মোহাম্মদপুরের কুলীন বংশ ভুঁইয়া খাজা বাড়ির অন্য গ্রামের আরও একটি পরিবারসহ বসতি স্থাপন করেন। নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি ও সামাজিকতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিকদার ছাহেব ও তার পরবর্তী বংশধরেরা উত্তরের গ্রাম শোভনদণ্ডির কয়েকটি প্রতাপশালী পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন। একই কারণে দক্ষিণের গ্রাম পূর্ব জোয়ারার আবদুর রজ্জক চৌধুরী বাড়ির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তাই বড় জেঠা বিয়ে করেছিলেন পূর্ব দিকের কাঞ্চননগর গ্রামের কেরামত আলী মুন্সি বাড়ি থেকে এবং মেজ জেঠা পটিয়া গ্রামের মোহাম্মদ নকি মুন্সি বাড়ি থেকে এবং আমার আব্বা জোয়ারা পেশকার বাড়ি থেকে ও চাচা বিয়ে করেছিলেন শোভনদণ্ডি গ্রাম থেকে”। অ্যাডভোকেট বদিউল আলম ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি পরলোকগমন করেন।
লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।











