বদলে যাবে যোগাযোগ ও জীবন-জীবিকা

ছনুয়া-রাজাখালী সেতুর জন্য অপেক্ষা সেতু নির্মাণে একমত, স্থান নির্ধারণে ভিন্নমত স্বরাষ্টমন্ত্রীর সুপারিশে আশার আলো, দ্রুত সমীক্ষা ও নির্মাণ শুরুর দাবি

দেলওয়ার হোসাইন, পেকুয়া | বৃহস্পতিবার , ২২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়ন ও কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী জলকদর খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু নির্মিত হলে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা–বাণিজ্যসহ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হতে পারে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ভৌগোলিকভাবে ছনুয়া বাঁশখালী উপজেলার অংশ হলেও দৈনন্দিন প্রয়োজনের তারা পেকুয়ার ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার, ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক কাজে পেকুয়া তুলনামূলকভাবে নিকটবর্তী। কিন্তু মাঝখানে জলকদর খাল থাকায় বর্তমানে নৌকায় পারাপারই তাদের প্রধান ভরসা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে রোগী, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ, কৃষক ও জেলেদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, ছনুয়া থেকে বাঁশখালী উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার হলেও পেকুয়া পৌরসভার দূরত্ব ১০ কিলোমিটারের কম। ফলে ছনুয়ার মানুষের জন্য পেকুয়া গুরুত্বপূর্ণ ও নিকটবর্তী যোগাযোগকেন্দ্র।

জলকদর খালে সেতু নির্মাণ করা হলে দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমবে। পাশাপাশি ছনুয়ার কৃষক ও মৎস্যজীবীরা সহজে পেকুয়ার বাজারে পণ্য নিতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনও সহজ হবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান বলেন, খালের ওপর একসময় বাঁশের সাঁকো ছিল দুই পাড়ের মানুষের পারাপারের ভরসা। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর স্থায়ী কোনো যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রয়োজনে প্রতিদিন মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় খাল পার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের জন্য এ পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগের জন্য এখানে একটি স্থায়ী সেতু এখন সময়ের দাবি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুপারিশে আশার আলো : জলকদর খালের ওপর সেতু নির্মাণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সুপারিশের খবরে স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাক্ষরিত একটি ডিও লেটার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম। তিনি জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রাজাখালী–ছনুয়া সংযোগে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় জলকদর খালের ওপর প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও অনুমোদন শেষে দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চিকিৎসাসেবা ও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে : স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক জসিম উদ্দিন বলেন, দুই উপজেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে রোগীদের দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতাল ও উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া সহজ হবে। এতে দুর্গম এলাকার মানুষের সময় ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, কৃষিপণ্য ও মৎস্য পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা–বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। যোগাযোগ সহজ হলে পর্যটনসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

স্থানীয়দের ধারণা, সেতুটি নির্মিত হলে ছনুয়া, রাজাখালীসহ আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবে। স্থানীয়দের হিসাবে এর সুফল প্রায় ৮০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।

সেতু নির্মাণে একমত, স্থান নির্ধারণে ভিন্নমত : সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য থাকলেও সেতুটি ঠিক কোন স্থানে নির্মাণ করা হবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। ছনুয়া ইউনিয়নের ছেলবন এলাকায় ভাঙা সাঁকোর পাদদেশে সেতু নির্মাণের দাবিতে সম্প্রতি মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থান দিয়ে দুই পাড়ের মানুষ যাতায়াত করে আসছেন এবং সেখানে সেতু হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরাসরি উপকৃত হবে।

অন্যদিকে রাজাখালী–ছনুয়া খয়রাতি ঘাট এলাকায় সেতু নির্মাণের দাবিতে পৃথক মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। দাবিকৃত স্থান পরিদর্শন করেছেন পেকুয়া উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ। ফলে সেতুর চূড়ান্ত স্থান নির্বাচন এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, স্থানীয় কোনো পক্ষের দাবির ভিত্তিতে নয়, কোন স্থানে সেতু নির্মাণ করলে সর্বাধিক মানুষ উপকৃত হবে তা কারিগরি সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেতুর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক নির্মাণের সুযোগ, মানুষের যাতায়াত, জমি অধিগ্রহণ, নৌযান চলাচল, খালের পানি প্রবাহ, পরিবেশগত প্রভাব এবং নির্মাণ ব্যয়–সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে স্থান নির্বাচন করা উচিত।

দ্রুত সমীক্ষা করে নির্মাণ শুরুর দাবি : স্থানীয় বাসিন্দা লায়ন মোহাম্মদ ইমরুল কায়েস বলেন, ছনুয়া–রাজাখালী সংযোগ সেতু কোনো বিলাসী অবকাঠামো নয়; এটি দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তবে সেতুটি টেকসই ও কার্যকর করতে হলে আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি সমীক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে।

তিনি বলেন, দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে স্থান নিয়ে যে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন করে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সেতুর স্থান নির্ধারণ করা দরকার।

এরপর বিলম্ব না করে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি, অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে।

স্থানীয়দের দাবি, সেতুর স্থান নিয়ে মতপার্থক্য দ্রুত নিরসন করে কারিগরি সমীক্ষা সম্পন্ন, উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে যত দ্রুত সম্ভব নির্মাণকাজ শুরু করা হোক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকক্সবাজারে সাগরে ডুবে তিন পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ২
পরবর্তী নিবন্ধচার মুসলিম দেশের বদর সমঝোতা চুক্তি