নগরীর আকাশ জুড়ে ফানুসের মেলা। শত শত ফানুসে বর্ণিল আলোয় বর্ণিল হয়ে উঠেছে পুরো আকাশ। সেই সাথে আতশবাজির ফোয়ারায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠা চারদিকে বাদ্য–বাজনা বাজিয়ে তরুণদের নাচগানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে উদযাপিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর নন্দনকাননের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানেও যথাযোগ্য মর্যাদায় এবং উৎসবমুখর পরিবেশে উৎসবটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রবারণা উৎসব উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর ডিসি হিল সংলগ্ন বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে মঞ্চ থেকে শত শত ফানুস উড়ানো হয়। পুরো আকাশ ভরে যায় রঙিন ফানুসে। এক মাস ধরে ধর্মচক্র, শিবলী সংসদ, আর্য্য সংঘ, সম্যক, মহাবোধি, সিদ্ধার্থ সংঘ, সারিপুত্রসহ বৌদ্ধ যুব সংগঠনগুলো ফানুস তৈরির কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চট্টগ্রামের চেরাগী মোড় থেকে শুরু হয়ে পুলিশ প্লাজার আগ পর্যন্ত এবং লাভলেইন মোড় পর্যন্ত মানুষ আর মানুষ। নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে ফানুস উড়িয়ে প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব পালন করছেন এ ধর্মের অনুসারীরা। নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির ছাড়াও কাতালগঞ্জ নবপতি বিহার, আগ্রাবাদ শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার, দেবপাহাড় পূর্ণাচর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার এবং মোমিন রোডে সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারসহ বিভিন্ন মন্দিরে ধর্মীয় সমাবেশ এবং ফানুস উড়িয়ে এ উৎসব পালন করা হচ্ছে। প্রবারণা পূর্ণিমা ঘিরে মন্দিরের চারপাশে বসেছে বিভিন্ন সামগ্রীর মেলা। চট্টগ্রামকে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, নান্দনিক ও সমপ্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, আমরা চাই, চট্টগ্রাম হবে সব ধর্মের মানুষের জন্য একটি নিরাপদ নগরী, সমপ্রীতির নগরী ও সাম্যের নগরী। আসুন, সবাই মিলে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তুলি। গতকাল প্রবরণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দানোৎসব–২০২৬ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ঐতিহ্যগতভাবে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির নগরী। এ নগরে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে বসবাস করবে। কোনো অপশক্তি যেন নগরীর সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি শান্তিপূর্ণ নগরী গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।
জানা গেছে, ভিক্ষুসংঘের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তির এই পবিত্র দিনকে কেন্দ্র করেই প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করা হয়। প্রবারণা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য একটি আবশ্যক বিধিবদ্ধ নিয়ম। প্রবারণা পূর্ণিমা আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। আত্মশুদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণের আয়োজন হলো প্রবারণা। অসত্য ও অকুশল কর্মকে বর্জন করে সত্য ও কুশল কর্মকে বরণ করাই প্রবারণার মূল শিক্ষা। প্রবারণার অর্থ নিষেধ করা, দোষত্রুটি স্বীকার, শিক্ষা সমাপ্তি, অভিলাষ পূরণ, আশার তৃপ্তি, প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা প্রভৃতি। সাধারণ গৃহীরা সকাল থেকে বৌদ্ধবিহারে পূজা উত্তোলন, সূত্র পাঠ এবং পঞ্চশীল ও অষ্টশীলব্রত পালন করে সারা বিশ্বের শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে সমবেত প্রার্থনা করেছেন। জগতের সব প্রাণীর দুঃখ হতে মুক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করেছেন। বিকেলেও একইভাবে বিহারে সমবেত প্রার্থনা করা হয়। পরে বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল পূজা, বুদ্ধপূজা, বুদ্ধমূর্তি দান, অষ্টপরিষ্কার দান, সংঘ দান ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পিন্ডদান অনুষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নানা ধর্মদেশনা প্রদান করেন।












