প্রিয় দৈনিক আজাদী ও কিছু কথা

কামরুল আনোয়ার চৌধুরী | শনিবার , ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ

দৈনিক আজাদী সারা চট্টগ্রাম জেলার সর্বাধিক প্রচারিত, প্রভাব বিস্তারকারী এক জাতীয় দৈনিক। দৈনিক আজাদীর পূর্বে চট্টগ্রামে পাঞ্চজন্য, জ্যোতি, পূবালী প্রভৃতি নামে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা ছিল। দৈনিক আজাদী প্রকাশকালীন দৈনিক সমাচার, দৈনিক আজান, ঞযব ঊধংঃবৎহ ঊীধসরহবৎ, ঞযব চবড়ঢ়ষব‘ং ঠরব িনামে পত্রিকা চালু ছিল। এগুলো প্রকাশিত হতো ১৯৭১ সাল এর পূর্বে ৬০ দশকে। ১৯৭১ এর পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় দৈনিক আজাদী। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশবাংলা, গণশক্তি, আন্দোলন, স্বাধীনতা, মিছিল, সমাজ, সেবক প্রভৃতি নামে আরো কয়েকটি দৈনিক প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো বেশি টেকেনি। ১৯৭৬–৭৭ এর দিকে নয়াবাংলা নামে এক দৈনিক প্রকাশিত হয়ে দীর্ঘদিন চলেছিল। বর্তমানে শুধু টিকে আছে দৈনিক পূর্বকোণ, দৈনিক কর্ণফুলী, ঞযব চবড়ঢ়ষব‘ং ঠরব।ি দৈনিক আজাদী সগৌরবে টিকে আছে। বর্তমানে ৬৭ বছরে পর্দাপণ করেছে দৈনিক আজাদী।

দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা আবদুল খালেক যখন প্রকৌশল বিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন তখন উপমহাদেশে তৎকালীন পরিবেশ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। অতি উচ্চ মেধা ছাড়া শিক্ষাদীক্ষার উচ্চস্থানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আব্দুল খালেক অবিভক্ত ভারতে বহু দূরবর্তী চট্টগ্রামের মফস্বল অঞ্চল থেকে ভারতে গিয়ে তড়িৎ প্রকৌশলে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পত্র–পত্রিকার আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে সব গৎ বাধা। তাকে নিয়ে কোন বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা হয়নি।

আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার তড়িৎ প্রকৌশলী ছিলেন। বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি করে চট্টগ্রাম শহরে আলোকায়নে ভূমিকা পালন করেছেন। অচিরেই বুঝতে পারেন মানুষের মনের আলোকায়ন সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পত্রিকা প্রকাশে হাত দেন। ‘কোহিনুর’ নামে গ্রন্থ বিপণি স্থাপন করেন। এর পিছনে তার মধ্যে কি মহত্তর প্রেরণা কাজ করেছিল?

আবদুল খালেক যখন পশ্চিম বঙ্গের তথা ভারতে ছিলেন, তখন সারা অবিভক্ত ভারত জুড়ে রাজনীতিতে টালমাটাল অবস্থা। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ, বিপ্লবীদের হামলা, পাকিস্তান আন্দোলন প্রভৃতি নিয়ে ভারত বর্ষ তোলপাড়। এ সময় রাজনীতিবিদগণ রাজনীতি জমজমাট রাখার জন্য প্রকাশ করছেন পত্রিকা। গড়ে উঠেছিল রাজনীতি মনস্ক সাংবাদিক সমাজ। অনেক সুখ্যাত কবি লেখক তখন সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আকরাম খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ, সামশুদ্দীন আবুল কালাম, মুজিবুর রহমান, মোহাম্মদ মোদাব্বের, হরিশ মুখুয্যে, কুলদীপ নায়ার আরো অনেকে। আবদুল খালেক তখন হয়তো তাদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন এবং প্রেরণা লাভ করেছিলেন। তিনি জীবনকালে তার জীবন স্মৃতির কথা বলেননি। পূর্বে উল্লিখিত বরেণ্য সাংবাদিকগণের অনেকেই ছিলেন গ্রন্থ লেখক। আবদুল খালেক বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন বলে জানা গেলেও সংরক্ষণ করা যায়নি। অনেক পাঠাগারে ১৫০/২০০ বছরের গ্রন্থ পাওয়া যায়। বর্তমানে কবি–লেখকদের অনেক গ্রন্থের শততম প্রকাশ বর্ষ পালিত হচ্ছে। তার লেখা বইগুলো সংরক্ষণ করা হলে আবদুল খালেকের নাম উজ্জ্বলভাবে শোভা পেত। দৈনিক আজাদী জাতীয় পর্যায়ে প্রখ্যাত হওয়া অনেক কবি লেখকের জন্ম দিয়েছে। তারাও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেনি।

দৈনিক আজাদী ইতিহাসের গৌরব ধারণকারী এক পত্রিকা। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের আলোড়ন সৃষ্টিকারী অনেক ঘটনা দৈনিক আজাদীর মাধ্যমে পাঠক সমাজ জানতে পেরেছে। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবিতা যেমন কোহিনূর প্রেসে ছাপা হয়েছিল। তেমনি ১৯৭১ স্বাধীনতার প্রথম কবিতা দৈনিক আজাদীতে ছাপা হয়েছিল। রচয়িতা দৈনিক আজাদীর স্বনামখ্যাত সাংবাদিক কাজী জাফরুল ইসলাম। এটিই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম কবিতা বলে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে জানা যায়। ভাষা আন্দোলনের কবিতা প্রকাশিত হলে সরকারি নির্দেশে পুলিশ কোহিনূর প্রেসে হানা দেয়। আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারকে পুলিশী গ্রেপ্তার থেকে বাঁচাতে দবির উদ্দীন নামে প্রেস ম্যানেজার স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন। এ রকম নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা ব্যাপী চলে প্রবল আন্দোলন। চলে, মিছিল, মিটিং, বিক্ষোভ সমাবেশ। রামগড় হতে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো চট্টগ্রামের শিক্ষিত, অশিক্ষিত, জাতিধর্ম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজ সেবক বাদশা মিয়া চৌধুরী ছিলেন এ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। এদিকে কুমিল্লা ও সিলেটের জনগণ তাদের স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সিদ্ধান্তে অনড়। তৎকালীন সংসদে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা। চট্টগ্রামের সাংসদগণ কখনো ওয়াক আউট করেছেন। অবশেষে তৎকালীন মন্ত্রী ফজলুল কাদের চৌধুরীর বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে গৃহীত হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে প্রতিদিন আজাদী পত্রিকায় তরতাজা গরম খবর ও বিশিষ্ট জনের লেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নেয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের পর কুমিল্লা ও সিলেটে দৈনিক আজাদীর কপি পোড়ানোর বহ্ন্যূৎসব হয়।

পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের দিকে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট টিম বাংলাদেশে আগমন করে। প্রথমে তারা চট্টগ্রাম আসে। দলের মধ্যে ইমরান খানও ছিলেন। ক্রীড়াপ্রেমিক জনগণ তাদের ফুলের মালা ও পুষ্পস্তবক নিয়ে স্বাগত জানাতে গেলে পাকিস্তানী ক্রিকেটারগণ উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে। ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। পুষ্পস্তবক মাটিতে ফেলে দেয়। সালাম দিলে তারা নমস্কার জানায়। হতবাক করা ঘটনা দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো বেমালুম চেপে যায়। কিন্তু দৈনিক আজাদী ও ঢাকার দৈনিক সংবাদ সাহসিকতার সাথে এ খবর বিশদভাবে প্রচার করে। এরজন্য দৈনিক আজাদী কর্তৃপক্ষ ও এ পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিকগণ বিভিন্ন গোষ্ঠী কর্তৃক হয়রানির শিকার হন। জনগণের জোরালো প্রতিবাদে পাকিস্তানি ১৯৭০ সালে সাড়া জাগানো ঐতিহাসিক নির্বাচনে দৈনিক আজাদী সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ পাকিস্তানের বলিষ্ঠ রাজনীতিবিদ ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে জাতীয় সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি নজির বিহীন ঘটনা। নির্বাচনের ফলাফলের দিন সন্ধ্যায় আজাদী থেকে সান্ধ্য সংখ্যা বেরিয়েছিল। অধ্যাপক খালেদ একটি গ্রন্থ ছাড়া আর কোন গ্রন্থ রচনা করেননি। অথচ তাঁর সমসাময়িক ঢাকার সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মানিক মিয়া), মাওলানা আকরাম খাঁ, আবু জাফর সামশুদ্দিন, মোহাম্মদ মোদাব্বেরসহ আরো অনেকে কলাম লিখেছেন, গ্রন্থ রচনা করেছেন। অধ্যাপক খালেদ চাইলে রাজনীতি, বিশ্বপরিস্থিতি, শিল্প সংস্কৃতির ওপর কলাম লিখতে পারতেন। গ্রন্থ রচনা করতে পারতেন।

দৈনিক আজাদীর বর্তমান সম্পাদক এম এ মালেক একজন খ্যাতিমান সমাজসেবক, মানবদরদী ও শিল্প সংস্কৃতির অকৃত্রিম পৃষ্ঠপোষক। তাঁর অনেক অনুগ্রহশীল আত্মীয়স্বজনদের প্রতি তিনি বেশ সদয়। তিনি দুটো বই রচনা করেছেন। যা পাঠক পড়ে অবশ্যই উপকৃত হবেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রবারণা: আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা ও মৈত্রীর শিক্ষা
পরবর্তী নিবন্ধমাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর শিক্ষা ও সমাজচিন্তা