বান্দরবানের আলীকদম–থানচি সীমান্তবর্তী দূর্গমাঞ্চলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করে কাঠ পাচারে ব্যস্ত একটি সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস ও কাঠ পাচারের সঙ্গে লামা–আলীকদম বনবিভাগের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ নির্বিচারে কাটার ফলে পুরো এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা যায়, জেলা সদর থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার এবং আলীকদম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া,কাকই পাড়া ,আদুই পাড়াসহ আশপাশের এলাকার প্রায় দুইশ একর জুড়ে এই বন উজাড় চলছে। আলীকদম–থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার অংশ পাড়ি দিয়ে আরও প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে গেলে পোলা ব্যাঙ ঝিরি এলাকায় গিয়ে চোখে পড়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র।
সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি। এলাকা থেকে দুই বছর ধরে পাড়া প্রাকৃতিক বন থেকে ৩০জন শ্রমিক দিয়ে মাতৃগাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। গাছের মধ্যে গর্জন, চাম্পা ফুল গাছ, কড়ই,বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি গাছ,চাপালিশসহ নানা প্রজাতির গাছ। বেঙঝিড়ি শুকিয়ে গেছে, পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ তীব্র পানি সংকটে। দুবছর আগে বড় বড় গাছ ছিল, বন ছিল, বনের মধ্যে ভালুক, হরিণ,বন্যশুকরসহ নানা প্রজাতির বন্যপশুপাখি বরপুর ছিল এখন বনও নেই পশুপাখিও নেই বলে জানান স্থানীয়রা। অনেক গাছ অর্ধেক কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, যেগুলোর আনুমানিক দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত।
স্থানীয়রা জানান, স্কেভেটর দিয়ে প্রতিনিয়ত পাহাড় ভেঙে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে এবং আলিকদম হতে থানচি উপজেলার যাওয়ার রাস্তার ২৩কিলো নামক স্থান দিয়ে আইনশৃংখলাবাহিনীর চেকপোস্টকে পাশ কাটিয়ে কলার ঝিড়ি নামক বাইপাস রাস্তা ব্যবহার করে নিয়মিত কাঠ পাচার করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কাটা গাছের একটি অংশ বনবিভিাগ কর্তৃক অনুমতিপত্র ‘জোত পারমিট’–এর কাগজ দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে আলিকদমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। অন্য অংশ আলীকদমের অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীকদমের আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগরের নেতৃত্বে একটি চক্র এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। লংলেইন ম্রোর নামও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই বন ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত দুই বছর ধরে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক দিয়ে মাতৃগাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে। গর্জন, চাম্পা, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি ও চাপালিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে পুরো এলাকা এখন প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে।
গাছ কাটার শ্রমিক শামসুল আলম বলেন, ঐখানে ১৯ দিন ধরে গাছ কাটার কাজে যুক্ত রয়েছেন। চকরিয়া থেকে আসা আরেক দল শ্রমিক দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন। শ্রমিকদের টিম লিডার মাঝি মোঃ ইসমাইল জানান, তারা আবুহান মোঃ ইসমাইল সওদাগরের অধীনে কাজ করছেন এবং প্রতিদিন একটি ট্রাক দিয়ে দুইবার কাঠ পরিবহন করা হয়।
স্থানীয়রা আরও জানান, বন উজাড় ও ঝিরির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন মারাত্মক পানি সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বনের বন্যপ্রাণীও বিলুপ্তির পথে।
আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন, এই ঝিরির পানির ওপর ৭–৮টি পাড়া নির্ভরশীল। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।
স্থানীয় নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, ‘দুই বছর আগেও এখানে হরিণ, ভালুক, বন্য শূকর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস ছিল। এখন বনও নেই, প্রাণীও নেই।” পামিয়া পাড়ার মেন চং ম্রো বলেন, “আগে ব্যাঙ ঝিরিতে প্রচুর পানি ও মাছ –কাকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে, আমরা এখন নিরাপদ পানির চরম সংকটে আছি।’
স্থানীয় লুংলেই ম্রো দাবি করেন, তার বাবা চাহ্লা ম্রো ৫০ একর বন ৪০ হাজার টাকায় ৫ বছরের জন্য ইসমাইল সওদাগরের প্রাকৃতিক বন বিক্রি করে দিয়েছেন। মোঃ ইসমাইল নামে একজন সাংবাদিক, বনবিভাগ, প্রশাসন সবকিছু ম্যানেজ করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং মামলা মোকদ্দমার অভয় দিয়ে প্রায় ২০০ একর এলাকা থেকে গাছ কাটছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
তবে অভিযুক্ত কাঠ ব্যবসায়ী আবুহান মোঃ ইসমাইল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চাহ্লা ম্রো’র জুম থেকে ‘মরাগাছ’ লাকড়ি হিসেবে ১৫ হাজার টাকায় কিনেছেন। ঘটনাস্থলে সাংবাদিক ঘুরে আসার পর শ্রমিকরা বর্তমানে গাছ কাটা বন্ধ করেছেন আর সেখানে এখন কোনো গাছ কাটার শ্রমিক নেই বলেও দাবি করেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভুমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জোয়াম লিয়ান আমলাই বলেন, ইসমাইল নামের একজন অসাধু ব্যবসায়ী দুইবছর ধরে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে কাঠ পাচার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে বনবিভাগের সহযোগীতা ছাড়া কোনভাবেই দুইবছর যাবৎ অবৈধভাবে বন উজার করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ কল্পে, জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে অবশ্যই অবৈধ কাঠপাচার রোধ করতে হবে, এই কাজে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
বনবিভাগের তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন বিভাগের কার্যক্রম নেই। তবে অবৈধ কাঠ পাচারের ঘটনা ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বনাঞ্চল উজাড় ও কাঠ পাচারের সাথে বনবিভাগের যোগসাজশ নেই বলে দাবি করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, বিষয়টি আমি অবগত নই। আর পাড়াবাসীর কোনো আবেদনও পাইনি। প্রয়োজনে পুলিশ ফোর্স নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এই প্রথম স্থানীয় সাংবাদিকদের মারফতে শুনেছি। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।













