আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬’ উদযাপিত হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্তের আলোকে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘের মতে, পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অভূতপূর্ব বৈশ্বিক জনসংখ্যার এ বৃদ্ধি ঘটেছে মূলত জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, পুষ্টি, উন্নত জীবনযাপন রীতি, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ওষুধের কারণে মানুষের গড় আয়ু বাড়ায়, বাংলাদেশও যার ব্যতিক্রম নয়। তবে কিছু দেশের বেলায় উচ্চ ও স্থির উর্বরতার অবদান আছে। আগামী ২০৩৭ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা ৯০০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে বলে প্রক্ষেপণে বলা হচ্ছে। কাজেই বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কটি সাদা চোখে স্পষ্টতই দেখা যায় অর্থাৎ বেশি মানুষ বেশি অভিঘাৎ। আরো লক্ষণীয় যে, সাম্প্রতিক দশকগুলোয় বিশ্ব জনসংখ্যায় যে নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে তাতে বয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ কোটি মানুষ ষাটোর্ধ্ব, ২০৫০ সাল নাগাদ ২০০ কোটি হবে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। উল্লেখ্য, সে বছরই মানব ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ষাটোর্ধ্ব বয়স্কদের সংখ্যা শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। জাতিসংঘ অনুযায়ী ১৯৫০–২০১০ সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রত্যাশিত আয়ু ৪৬ বছর থেকে ৬৮ বছরে উন্নীত হয়েছে, এ শতকের শেষে তা ৮১ বছরে ঠেকবে। বাংলাদেশের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৫০ সালে দেশের প্রবীণ জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৪ কোটি ৬০ লাখে।
বিশ্ব জনসংখ্যার কাঠামোয় বর্তমানে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি হয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন পরিবর্তন ঘটেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর এক নতুন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে চলা দুটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার ফল এই পরিবর্তন। এর একটি হলো বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমে যাওয়া, অন্যটি মানুষের আয়ু বৃদ্ধি। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পুষ্টি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে মানুষ আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি দিন বাঁচছে। অন্যদিকে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দেরিতে বিয়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থার সহজলভ্যতার কারণে বিভিন্ন দেশে মানুষ কম সন্তান নিচ্ছে। ধনী দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ধক্য সবার জন্যই কঠিন হতে পারে। তবে বার্ধক্যজনিত দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা, একা বসবাস করা এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল প্রবীণদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। এ পরিস্থিতিতে প্রবীণ মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সরকারগুলোকে অর্থনৈতিক নীতি, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের যত্ন ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
মানুষের জীবনে বার্ধক্যের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আজকের প্রবীণরাই আমাদের জন্ম দিয়েছেন, প্রতিপালন করেছেন, আর গড়ে তুলেছেন এই আধুনিক সমাজ, নগর সংস্কৃতি আর সভ্যতা। বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন প্রবীণ। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ অধিকাংশ প্রবীণ ব্যক্তিরাই ক্রমবর্ধমান হারে অবহেলিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রবীণের যুক্তি আর নবীনের শক্তি–দুইয়ে মিলে সমাজের মুক্তি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ এবং চুক্তির ছায়াতলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রবীণ নাগরিকরা বর্তমানে অনেক সুরক্ষিত ও নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়, বরং এটি সমাজের একটি মৌলিক এবং নৈতিক দায়িত্ব। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রবীণরা যেন অবহেলা, নিপীড়ন বা বৈষম্যের শিকার না হন এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই কর্তব্য। বাংলাদেশের সংবিধানে এবং জাতীয় নীতিমালায় প্রবীণদের এই অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা সমস্যায় পড়েন প্রবীণেরা। প্রবীণদের ভাতা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান কিংবা আয়ের সুযোগ তাঁদের ক্ষমতায়ন করবে। পরিবারের সদস্যদেরও প্রবীণ অধিকার সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, পরিবার ছাড়া প্রবীণদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অসম্ভব। এতেই সমাজে প্রবীণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।








