পৌরকর আদায়ে ব্যর্থ হলে ব্যাহত হবে লক্ষ্য পূরণ

চসিকের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিজস্ব উৎসে আয়কে প্রাধান্য

মোরশেদ তালুকদার | বুধবার , ১ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ

নগর উন্নয়ন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানো হয় সংস্থাটির নিজস্ব উৎসের আয় এবং সরকারের উন্নয়ন অনুদানের মাধ্যমে। এর মধ্যে নিজস্ব উৎসের যে আয় তার বড় অংশ খরচ হয় চসিকের কর্মকর্তাকর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধে। ফলে নগর উন্নয়ন ব্যয়নির্ভর করে সরকারের অনুদানের ওপর। ফলে নগরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরে চসিককে স্বাবলম্বী করে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর কথা বলে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল চসিকের ২০২৬২০২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়, যেখানে নিজস্ব উৎসে আয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটে নিজস্ব উৎসের আয় ধরা হয় ৫২ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা টাকার অংকে ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এতে মনে হচ্ছে চসিক স্বাবলম্বী হচ্ছে। তবে বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কারণ নিজস্ব আয়ের যে খাত তা গৃহকরের ওপর নির্ভরশীল। গৃহকর খাতে আয় ধরা হয় ৬২৩ কোটি টাকা, যা নিজস্ব উৎসে সম্ভাব্য মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি। অর্থাৎ চসিককে স্বাবলম্বী গড়তে স্থায়ী সম্পদ বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়নি । এক্ষেত্রে পৌরকর আদায়ে ব্যর্থ হলে বা করদাতারা পৌরকর পরিশোধ না করলে নিজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণে ধাক্কা খাবে সংস্থাটি।

অবশ্য চসিককে স্বাবলম্বী করা নিয়ে বাজেটে প্রাধান্য না থাকলেও নগরবাসীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা দূরীকরণে গুরুত্ব দিয়েছেন মেয়র। এ খাতে ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া মশক নিধনে বাড়ানো হয়েছে বরাদ্দ। একইসঙ্গে পাইপলাইনে রয়েছে এমন ১২টি প্রকল্পের কথা জানান মেয়র ডা. শাহাদাত। ১১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগর উন্নয়নে আসবে দৃশ্যমান পরিবর্তনএমনটাই আশা

মেয়রের।

পৌরকর প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরবাসীর একমাত্র সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। একটি ক্লিন, গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। সামর্থ্যের মধ্যে সেই প্রত্যাশা পূরণে চসিক নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলা যেতে পারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সদিচ্ছা থাকলেও আর্থিক সক্ষমতা অপ্রতুল। আর্থিক সক্ষমতা ছাড়া নগরবাসীর শতভাগ প্রত্যাশা পূরণ কষ্টসাধ্য। শুধুমাত্র পৌরকরের ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। তাই নাগরিক সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করতে হলে সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে

হবে।

তিনি বলেন, কর্পোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করাই আমার লক্ষ্য। অতীতে অযৌক্তিকভাবে যেসব গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল সেগুলো যৌক্তিক করতে নিয়মিত রিভিউ বোর্ড বসানো হচ্ছে। যাচাইবাছাই শেষে সঠিক ও ন্যায্যভাবে কর নির্ধারণ করা হচ্ছে । তবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই ।

জলাবদ্ধতা নিরসনে বরাদ্দ ১১২ কোটি টাকা : জলাবদ্ধতা নিরসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননে বরাদ্দ রাখা হয় ১১২ কোটি টাকা। গতবার (২০২৫২৬) এ খাতে ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে খরচ হয় ৬৫ কোটি টাকা। এবার জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজস্ব তহবিল থেকে দুটি খাতে ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গতবার খাত দুটিতে খরচ হয় ২০ কোটি টাকা। এছাড়া এডিপি খাতে এবার ২১টি খালনালা পুনঃখনন ও মাটি উত্তোলনে বরাদ্দ রাখা হয় ৭৫ কোটি টাকা। এ খাতে গতবার খরচ হয় ৪৫ কোটি টাকা।

বরাদ্দ বেড়েছে মশক নিধনে : প্রস্তাবিত বাজেটে মশক নিধন খাতে ১৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ওষুধ ক্রয়ে ১৫ কোটি টাকা এবং ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কেনায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গত অর্থবছরে (২০২৫২০২৬) মশক নিধন খাতে বরাদ্দ ছিল ৭ কোটি টাকা। তবে খরচ হয় ৫ কোটি ৩৮ লাখ ৩২ হাজার ৫৭৩ টাকা।

মশক নিধন প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত বলেন, মশক নিধন কাজের মান বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ৭ জন পরিদর্শক (মশক নিয়ন্ত্রণ) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে সকালবেলা মশা নিধনকারী লার্ভিসাইড এবং বিকালে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিজ্ঞানসম্মতভাবে শহরজুড়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত বিশেষ দল দ্বারা ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে কীটনাশক এবং সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আমেরিকান প্রযুক্তির বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড বিটিআই মহানগর এলাকায় প্রয়োগ করা হচ্ছে।

পাইপলাইনে ১১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার ১২ প্রকল্প : পাইপলাইনে রয়েছে এমন ১২টি প্রকল্পের কথা জানান মেয়র। এর মধ্যে ১১টি প্রকল্পে ব্যয় হবে ১১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলো হচ্ছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকায় সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রাথমিক সড়কের উন্নয়ন প্রকল্প, ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ২১ খালসহ অন্যান্য খাল খনন প্রকল্প, ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাস্তবায়িত ৩৬ খালসহ লক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন প্রকল্প, ৪০০ কোটি টাকায় ইমপ্লিমেন্টেশন অব স্মার্ট লাইটিং (সোলার/ননসোলার) উইথ এআই বেইজড সিসিটিভি সার্ভিলেন্স সিস্টেম ইন চট্টগ্রাম সিটি এরিয়া ফর এনশিওরিং স্মার্ট অ্যান্ড সেফ সিটি প্রকল্প, ৪৫০ কোটি টাকায় ডেভেলপমেন্ট অব স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম ফর ডিফারেন্ট এরিয়াজ অব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রকল্প, ৪৫০ কোটি টাকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উন্মুক্ত স্থানসমূহ আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও সবুজায়ন প্রকল্প, ৫০ কোটি টাকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় কিচেন মার্কেটকাম বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প, ১ হাজার কোটি টাকায় সিটি কর্পোরেশনের আওতায় রেল ক্রসিংয়ের ওপর ওভারপাস নির্মাণ প্রকল্প, ৩০০ কোটি টাকায় সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন দেওয়ানহাট ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প, ২৯৮ কোটি টাকায় সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আধুনিক যান বা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্প এবং ২০৩ কোটি আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্প। বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ২৭ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ল্যান্ডফিল নির্মাণ প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে বলে জানান মেয়র।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রার্থিতা বাতিল, সংসদে যাওয়া হচ্ছে না আসলাম চৌধুরীর
পরবর্তী নিবন্ধনগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ