পুষ্টিহীনতা হামের উপসর্গের অন্যতম কারণ

ডা. দুলাল দাশ | বৃহস্পতিবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ

পুষ্টি বলতে আমরা বুঝি সুষম পুষ্টিকর খাদ্য যা মানব শরীরে শক্তি যোগায় যা খেলে ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। বাড়ে রোগ প্রতিরোধের বিশেষ ক্ষমতা। অনেকেই আবার সুষম খাদ্য বোঝে না। তাহলো প্রোটিন, কার্বোহাড্রেড, ফ্যাট, লোহ, ভিটামিন প্রভৃতি। একটা অপুষ্ট শিশুর চেয়ে হৃষ্ট পুষ্ট শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এবারে হামের প্রাদুর্ভাব ৮০% অপুষ্টিজনিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তার কারণ। এটা আমাদের স্বাস্থ্যগত ও জাতীয় সমস্যা। দারিদ্র্য পীড়িত এক শ্রেণির মানুষ তাদের শিশুদের জন্য সুষম পুষ্টিকর খাদ্য জোগাড় করা তাদের কল্পনার বাইরে। অথচ জাতি হিসাবে তাদের অবস্থার জন্য আমরা কিছুই করতে পারছি না। তাদের মধ্যে দিন দিন বেকারত্ব বাড়ছে অনেকাংশে। অখাদ্য, কুখাদ্য, কুসংস্কার, পুষ্টি জ্ঞানের অভাব এবং দারিদ্রতা পুষ্টিহীনতার মূল কারণ। মাতৃ মৃত্যু শিশু মৃৃত্যু রোধে মায়ের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী যত্ন ও সুষম খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন। শিশুকে শাল দুধসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ মায়ের দুধ খাওয়ানাতো কোনও দ্বিমত নেই। আবার যথাসময়ে শিশুদের টিকাদান খুবই বাধ্যতামূলক করা উচিৎ। বাংলাদেশে ১৮% গর্ভবতী মা অপুষ্টির শিকার এবং ২৩% শিশু প্রয়োজনের চেয়ে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয় ৭৩%, শিশুর মা ও পরিবারের অন্যসদস্যরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না। ৩৬% উচ্চতা কম, ২৪% কৃষকায়। তবে ২০২৫ সালের ডাটা অনুযায়ী এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। মায়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে বিধায় স্বাস্থ্যসচেতন হয়েছে। উপরোক্ত কারণগুলি হামের উপসর্গের কারণ হতে পারে। হাম একটা ভাইরাস ছোঁয়াছে জনিত রোগ। ৩ মাস বয়স থেকে ৯ মাস, ৩ বৎসর থেকে ৬ বৎসর পর্যন্ত শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। ৩ মাস বয়স থেকে ৬ বছর পর্যন্ত যে কোন সময় হতে পারে। এবারের হামের সংক্রমণ একটা বিপর্যয়। একটা প্রাদুর্ভাব, যদিও সরকার এটাকে মহামারি বলতে নারাজ। হাম এবং হামের উপসর্গ যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, ডিহাইড্রেশন জটিলতা নিয়ে আজ অবধি প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে। সংখ্যা প্রায় হাজার ছুঁই ছুঁই। এদিকে প্রতিদিন সারাদেশে থেকে ২ হাজার হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল ও রোগী ভর্তি কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না।

ডাক্তারি ভাষায় অপুুষ্টিকে বলা হয় মেলনিউট্রিশন। ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা জিয়াউল ইসলাম এবং ডাইরোলজিস্ট খন্দকার মাহবুব জামিল বলেছেন যে অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে বলে যে কোন রোগ সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। ফলে টিকা দেওয়ার পরও পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি শরীরে তৈরি হয় না বা তৈরি হতে সময় লাগে। দেশের ১২ টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬ পরিবারের উপর পরিচালিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে হামে আক্রান্ত প্রতি ১০ পরিবারের মধ্যে ৯ পরিবারই চিকিৎসার খরচ মিটাইতে গিয়ে চরম ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। ৬১% পরিবারের দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে গেছে। রংপুর থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আসা এক হত দরিদ্র মাতার যাতায়াত ও পরীক্ষা নিরীক্ষায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এটা প্রমাণ করে দেশ জুড়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার চরম ঘাটতি রয়েছে। রংপুরেই এই রোগীর চিকিৎসা হওয়া উচিত ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী ১৫ মার্চ হতে অদ্যাবধি এক হাজারের কাছাকাছি হাম ও উপসর্গ নিয়ে রোগী মারা গেছে। প্রশ্ন জাগে সম্প্রসারিত উন্নত টিকাদান কর্মসূচি সত্ত্বেও হ্রাস এখনও কন্ট্রোল হচ্ছে না। তাতে মনে হয় প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় শিথিলতা, মাঠ পর্যায়ে তদারকির অভাব, দুর্গম অঞ্চলে সচেতনতা ও টিকা সরবরাহের ঘাটতি। এই মানবিক সংকটে রাষ্ট্রকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। দুর্দশাগ্রস্ত রোগাক্রান্ত পরিবারের জন্য নগদ আর্থিক সাহায্য। পুষ্টিকর খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ ব্যবস্থা। নিতান্ত দরিদ্র রোগীদের ডাক্তারী পরীক্ষা, ওষুধ, পথ্য, প্রয়োজনে যাতায়াত খরচ ব্যবস্থা। হত দরিদ্র যাদের নুন আনতে পান্থা ফুরায় তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বেকারত্ব ঘুচাতে হবে। তাদের অপসংস্কৃতি দূর করতে হবে।

সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়গুলি পোস্টারের মাধ্যমে এবং মাইকিং করে হাটে বাজারে, জনসমাবেশ স্থলে, ওয়াজ মাহফিলে, স্কুল কলেজে প্রচার করতে হবে। কিছুটা হলেও বিনাপয়সায় স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করা যায় উপায় বলে দিতে হবে। টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাধ্য করতে হবে। একটা শিশুর আসল মৃত্যু কিংবা চিকিৎসা করতে গিয়ে একটা পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় অবহেলারই সামিল। সাধারণভাবে চিন্তা করলে টাকার অভাবে সময়মত চিকিৎসা করাতে না পেরে, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে দিনের পর দিন রোগে ভুগতে ভুগতে যে শিশুটা মারা গেল এটা কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। সে যদি সময় মতো চিকিৎসা পেত ও পুষ্টি পেত সে ঠিক সেরে উঠতো জীবন ফিরে পেতো। সংক্রমণ সম্বন্ধে স্বাস্থ্যবিদ ডাঃ লেনিন চৌধুরী একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেনমায়ের অপুষ্টি ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার হ্রাস পেয়েছে। আবার মায়ের অপুষ্টির কারণে মায়ের বুকের দুধ শিশুরা পায় না। অথচ জন্মের পর মায়ের দুধ শিশুর প্রথম প্রতিরক্ষা বলয়। সেই বলয় দুর্বল হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বেই। কথা উঠেছে আগের বছর টিকা দেওয়ানি। অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছিল স্মরণ করুন ২০২০ সালে করোনা কালে আগে থেকেই পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকার ব্যবস্থা করেছিল বলেই কোটি কোটি প্রাণ বেঁচে গেছিল। আর এক গবেষণায় বলেছে ২০২৬ সালে ছড়িয়ে পড়া হামের মূল কারণ ভাইরাসের নতুন কোন রূপ নয় বরং বিশ্বজুড়ে সংক্রামক। বি৩ ধরনের বিস্তার এবং টিকাদান ও মাতৃদুগ্ধের অ্যান্টিবডি ঘাটতি। এই তিনটা কারণেই হামের প্রাদুর্ভাব, পুষ্টিহীনতা, ব্যাপক হারে নির্দিষ্ট সময়ে টিকা প্রদান না করা সেগুলির মধ্যে অন্যতম। আর একটা তথ্যে জানা যায় বিপুল জনগোষ্ঠীর একটা অংশ যে সরকারই অসুখ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। তারা ঐ অবস্থায় থাকে। তাদের আর্থিক দীনতা কেউই ঘুচাতে পারে না। অপুষ্টি তাদের নিত্যসঙ্গী। হামের ভয়াবহতা আমাদের শিখিয়েছে স্বাস্থ্য কেবল হাসপাতালের শয্যা বা ওষুধের প্রশ্ন নয়, এটা পুষ্টি।

প্রতিরোধ, তথ্যব্যবস্থা এবং সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত ফল। এর সাথে যোগ করতে হবে কর্মসংস্থান। একেবারে নিম্নবিত্তের জন্য অন্নসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ন্যূনতম পুষ্টি খাবারের ব্যবস্থা, হেলথ কার্ড, রেশনের ব্যবস্থা। তবে সরকার গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করার ফলে প্রাদুর্ভাব কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। পরিশেষে হামের মতো সংকটের অনুসন্ধান করে কারণ বের করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও অন্যান্য সংক্রমণ আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়বে।

লেখক : প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট,

বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপরিমিতিবোধ : ভারসাম্যের মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য
পরবর্তী নিবন্ধড. মো. আহসানুল হক : ওয়ান হেলথ ও ভেটেরিনারি শিক্ষায় অন্যতম পথিকৃৎ