কক্সবাজারের উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে নারী–শিশুসহ দশ জনের প্রাণহানির ঘটনায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশে বর্ষাকালে পাহাড় ধসের ঘটনা একটি গুরুতর সমস্যা, বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলো, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এটি সাধারণত ভারী বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্প ও অন্যান্য কারণে ঘটে থাকে। মাধ্যাকর্ষণের ফলে পাহাড় বা পর্বত গাত্র বেয়ে মাটির চাকা বা পাথর খন্ড নীচে পড়ে গেলে পাহাড় ধস ঘটে থাকে। প্রায় সময় পাহাড়ের ওপর জল ও মাটি মিশে কাদা আকারে বিপুল পরিমাণ মাটির স্তূপ নীচে গড়িয়ে আসলে তাকে এক ধরনের ভূমিধস বা পাহাড় ধস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ভূমি বা পাহাড় ধসের প্রধান কারণ হচ্ছে পাহাড় বা পর্বতের ঢালু গাত্রে মাটির অস্থিতিশীল অবস্থা। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ৬ জুলাই রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটে এসব দুর্ঘটনা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন, ক্যাম্প প্রশাসন ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর চালায় উদ্ধার অভিযান।
উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি শফিক বলেন, উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে রাত দেড়টার দিকে আশ্রিত রোহিঙ্গা মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর ধসে পড়ে পাহাড়ের বিশাল অংশ। মুহূর্তেই মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় পুরো ঘর। উখিয়ার ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি রশিদ উল্লাহ বলেন, বর্ষা এলেই তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে ওঠে পাহাড়ধস। পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালে বাঁশ, ত্রিপল ও মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো ঘর ভারী বৃষ্টিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সামান্য ধসও মুহূর্তেই কেড়ে নিতে পারে বহু প্রাণ। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মাইকিংসহ বিভিন্নভাবে সতর্ক করা হচ্ছে জানিয়েছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার। ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করে সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে। জীবন রক্ষায় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালগুলোতে ঘটতে পারে আরও ভূমিধস। তাই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব মৃত্যুকে কোনো অবস্থাতেই অনিবার্য বলা যাবে না। আমাদের দেশের পাহাড়গুলো মূলত দুর্বল শিলা–যেমন স্যান্ডস্টোন, সিল্টস্টোন ও শেল দিয়ে গঠিত। এগুলো নরম, ভঙ্গুর এবং দীর্ঘদিনের আবহাওয়াজনিত ক্ষয়ের কারণে ওপরের অংশে পুরু মাটির স্তরে পরিণত। অতিবৃষ্টিতে এই মাটি ও শিলা সহজে স্থিতিশীলতা হারায় এবং ভূমিধস ঘটে। এমন ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতার সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে মানুষের তৈরি বিপদ। পাহাড় কাটা, এর পাদদেশে বসতি নির্মাণ এবং গাছপালা উজাড় হওয়ার ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা নষ্ট হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বেশি–লাখ লাখ মানুষ সংকীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ঘনভাবে বাস করছেন। সেখানে পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থাও অপ্রতুল। তাই পাহাড় ধস রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে, পাহাড়কে ছিন্নমূল জনসাধারণের পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; পাহাড়ের চূড়ায় বা ঢালে যেসব ছিন্নমূল মানুষ অবৈধভাবে বসবাস করছে তাদেরকে নিরাপত্তার স্বার্থে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা চিহ্নিত করে বৈধভাবে বসবাসকারী লোকদেরকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে; যেকোনো অজুহাতে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন ও পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে; প্রাকৃতিক বনভূমি সংরক্ষণ করতে হবে; পাহাড় কাটা বন্ধ করার লক্ষে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশবিদদের আরো সক্রিয় করে তুলতে হবে।
বলা বাহুল্য, এবার কিন্তু বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরুর আগেই ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ঘটেছে। সামনে আরো কিছুদিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় আরও বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এব্যাপারে প্রশাসনের প্রস্তুতি আছে তো? মাইকিং করে সরে যেতে বলা হলেও দ্রুত সরে যাচ্ছে কি? বিকল্প ব্যবস্থাও প্রশাসন করতে পারছে না। তাই নিজেদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।







