পাহাড়ে অস্থিরতার নেপথ্যে অস্ত্রের ছায়া

জাহিদুল করিম কচি | বৃহস্পতিবার , ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি অঞ্চলটিকে বারবার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যে স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা প্রায় তিন দশক পরও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ১৯৯৮ সালে আত্মপ্রকাশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), যা পরবর্তী সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়। এর ফলে শান্তির আশা দেখিয়েও সংঘাত আর রক্তপাতের সেই পুরনো বৃত্তে বন্দি হয়ে আছে এই অঞ্চলটি।

শুধু তাই নয়, সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। ফলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার আড়ালে তাদের মূল সশস্ত্র তৎপরতার বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। সেখানে সংগঠনটির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

সূত্র বলছে, স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহনশ্রমিক, কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী, এমনকি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে। এই অর্থের একটি বড় অংশ সংগঠনের সশস্ত্র শাখা পরিচালনা, সদস্যদের রক্ষণাবেক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহে ব্যয় হচ্ছে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত একটি ঘটে ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে। রাঙামাটির নানিয়ারচরে ড্যানিডা–অর্থায়িত সড়ক প্রকল্প পরিদর্শনে যাওয়া তিন ইউরোপীয় প্রকৌশলী অপহৃত হন, পরে মুক্তিপণের বিনিময়ে যারা মুক্তি পান। ঘটনাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ওই সময়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।

২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর নানিয়ারচরের বগাছড়িতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নুরুল আলম গাজী নিহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্যমতে, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের হামলায় তিনি প্রাণ হারান। পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর চালানো অন্যতম বড় হামলা হিসেবে যা এখনো স্মরণ করা হয়।

এদিকে, বছরের পর বছর ধরে পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফ ও অন্যান্য আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ অব্যাহত আছে। এসব সংঘর্ষে সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে অপহরণ, গুম, হত্যা ও সংঘর্ষের অসংখ্য ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে।

এছাড়া, ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে অপহরণের ঘটনা। ২০২৫ সালে খাগড়াছড়ি সদর এলাকা থেকে পাঁচ শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনা, যা পরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর তাদের উদ্ধার করা হয়।

নারীর প্রতি সহিংসতার একাধিক অপহরণ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো বিচারিকভাবে নিষ্পত্তি না হলেও, ঘটনাগুলো পার্বত্য অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাহাড়ে ইউপিডিএফের অস্ত্রের উৎস ও সীমান্ত–সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানায়, বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী দুর্গম বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল ও অস্ত্রপাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সীমান্ত নিরাপত্তাকে জটিল করে তুলেছে। সামপ্রতিক সময়ে কেএনএফ ও মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইউপিডিএফের সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এসব সম্পর্কে এখনো গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবৈধ অস্ত্র, সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও সীমান্তপথে অবৈধ নেটওয়ার্কই। শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পরও সাধারণ মানুষ যদি অপহরণ, গুলি ও চাঁদাবাজির আতঙ্কে বসবাস করেন, তবে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, উন্নয়ন ও মানবিক নিরাপত্তারও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও আবাসিক সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাঙ্গুর জীববৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতি
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম বন্দর : সাহসী বিনিয়োগ ও সতর্ক হিসাব