পাচারের অর্থ উদ্ধারে ১০ দেশের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে : সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সারা দেশে সারের নতুন ডিলার নিয়োগের আশ্বাস । কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘পেপ্যাল’ চালুর উদ্যোগ

| বৃহস্পতিবার , ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

আওয়ামী লীগ সরকারের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ১০টি দেশ চিহ্নিত করে সে দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্ত করা, পারস্পরিক আইনি সহায়তা ও চুক্তির প্রক্রিয়া চালাচ্ছে সরকার। গতকাল বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে মুন্সিগঞ্জ৩ আসনের এমপি মো. কামরুজ্জামানের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই ১০ দেশ হলযুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকংচীন। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন সরকার প্রধান। খবর বাসস ও বিডিনিউজের।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাচারের এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ জন্য পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি করা এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা অনুরোধ বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশসমূহের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের মধ্যে তিন দেশ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। অপর সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্ক ফোর্স চিহ্নিত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইসসমূহের অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।

ওই তদন্ত দল গঠনের পর অগ্রাধিকার পাওয়া মামলাগুলোর অগ্রগতি সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সেগুলো হল. আদালতের মাধ্যমে চলতি বছরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ২. আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশেবিদেশে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ৩. পাচারের অর্থ পুনরুদ্ধারে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। ৪. সার্বিকভাবে বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। ৫. বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের অধীনে চুরির অর্থ উদ্ধার বিভাগ (স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন) গঠন করা হয়েছে।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

সারা দেশে সারের নতুন ডিলার : আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়াদের বাদ দিয়ে সারা দেশে সারের নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বের পর চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। চিফ হুইপ যেটি বলেছেন, উনি যখন বক্তব্যটি উপস্থাপন করেন তখন আমি খেয়াল করেছি। মোটামুটি পুরো সংসদ বিষয়টিকে ওয়েলকাম (স্বাগত) করেছেন। এ ব্যাপারে যদি পুরো সংসদের সম্মতি থাকে, তবে নিশ্চয় সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এর আগে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম ফ্লোর নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে অভিযোগ করেন, বর্তমানে রেশনিং ও সার বিতরণের দায়িত্বে থাকা ডিলাররা সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্যে সার পায় এবং ফ্যাসিস্টরা যেন বিতাড়িত হয়, সে জন্য পুরাতন ডিলার নিয়োগ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। উপস্থিত সংসদ সদস্যরা এ সময় টেবিল চাপড়ে স্বাগত জানান। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের অনুমতি নিয়ে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে তার মতামত তুলে ধরেন।

পেপ্যাল’ চালুর উদ্যোগ : প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বহুল প্রতীক্ষিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আগামী ৫ বছরে ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান এবং উচ্চপ্রযুক্তিতে কয়েক হাজার তরুণকে প্রশিক্ষিত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নাটোর৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় বিভিন্ন সংস্থা/দপ্তর তথ্যপ্রযুক্তির সমপ্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর কর্তৃক ৫ বছরে ১ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে এবং ৫ বছরে দুই লক্ষ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান করা হবে। ইতোমধ্যে ৭ হাজার ৫শ জন ফ্রিল্যান্সারকে ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকাল তিনটায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম কর্মসূচি ছিল প্রথম ত্রিশ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নকাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামসহ দেশের কোনো ক্যাম্পাসে গুপ্ত রাজনীতি করতে দেয়া হবে না
পরবর্তী নিবন্ধকাস্টমস থেকে নিলাম পণ্যের হিস্যা চায় চট্টগ্রাম বন্দর