শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। গতকাল শুক্রবার নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এবারের পুরস্কারের জন্য ৮৫ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান মানবাধিকারকর্মীর নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘ কর্মজীবনে রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং সংঘাত ও সহিংসতার শিকার মানুষের মনে আশা জাগাতে পিল্লাই অসামান্য নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যান্যদের পক্ষে তার শুরুর দিকের আইনি লড়াই থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে তার ভূমিকা মূলত এক সূত্রে গাঁথা। খবর বিডিনিউজের।
ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন নাভি পিল্লাই। গত বছর এই কমিশন তাদের প্রতিবেদনে জানায়, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। যদিও ইসরায়েল সে সময় প্রতিবেদনটিকে কলঙ্কজনক আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল। চিকিৎসা, পদার্থ, রসায়ন ও সাহিত্যের পর চলতি সপ্তাহে ঘোষিত এটি পঞ্চম নোবেল পুরস্কার। এর আগে ২০২৫ সালে এই পুরস্কার জিতেছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। ১৮৯৫ সালে সুইডিশ শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কারের প্রচলন হয়। প্রতি বছর তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়, যার বর্তমান অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন বা প্রায় ১২ লাখ ডলার।
এটি নির্ঘাত কোনও মশকরা : নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার খবর শুনে দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী এবং সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার নাভানেথেম নাভি পিল্লাই রসিকতা করে বলেছেন, এটি নির্ঘাত কোনও মশকরা। পুরস্কার ঘোষণার পর এক ভিডিও বার্তায় ৮৫ বছর বয়সি এই বর্ষীয়ান নারীর এমন কৌতুককর ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসে। একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে তার পেশাগত অভ্যাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে পিল্লাই হেসে বলেন, আইনজীবী ও বিচারক হওয়ায় আমি এখনও খবরটি সত্য কি না তা যাচাই করে নিতে চাই।
ট্রাম্পকে নিয়ে খোঁচা : অনুষ্ঠানে উপস্থিত সহকর্মীদের করতালির জবাবে রসিকতা করে পিল্লাই আরও বলেন, আপনারা যদি এভাবে আরও কিছুক্ষণ হাততালি দিতে থাকেন, তবে আমি হয়তো এই পুরস্কারের অর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেব।
নোবেল কমিটি পিল্লাইয়ের কাজের সাহসের যে প্রশংসা করেছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, সত্যি কথা বলার জন্য কেন সাহসের প্রয়োজন হবে? আপনি আইন ব্যাখ্যা করবেন এবং সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখে একটি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন–এটাই স্বাভাবিক।
নাভি পিল্লাইয়ের পরিচয় : ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাইয়ের পরিবার তামিল, তবে তিনি জন্মেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম ছিল নাভানেথেম নাইডু। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় যেমন রায় দিয়েছেন, তেমনই আন্তর্জাতিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাই কোর্টে নিয়োগ পাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক।
পিল্লাই বর্তমানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ধর্ষণ ও যৌন হিংসাকে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন পিল্লাই। এ সংক্রান্ত একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে তার উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। পাশাপাশি প্রচারমাধ্যম বা অপপ্রচারের মাধ্যমে গণহত্যায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টাতেও তার কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তার কর্মজীবনের অন্যতম লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক আইনকে আরও শক্তিশালী করা এবং গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা নিশ্চিত করা।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) একজন অ্যাডহক বা বিশেষভাবে নিযুক্ত বিচারক হন।
নরওয়ের নোবেল কমিটির মতে, পিল্লাইয়ের কাজ তুলে ধরে কীভাবে আন্তর্জাতিক আইন শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাতের সমাধান করতে পারে, শক্তিশালী রাষ্ট্র ও ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা দিতে পারে। কমিটির আরও বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল হয়ে পড়া এবং আইনের শাসনের উপর ক্ষমতার রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও এই পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো বজায় রাখা এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার উপর নোবেল কমিটি যে গুরুত্ব দিয়ে আসছে, সেই প্রেক্ষাপটেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
নরওয়ের অসলোভিত্তিক নোবেল কমিটি জানায়, চলতি বছর শান্তি পুরস্কারের জন্য ২৮৭ প্রার্থীর মনোনয়ন জমা পড়েছিল, যার চার ভাগের এক ভাগের কিছুটা বেশি ছিল বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষজ্ঞরা জানান, কমিটি সাধারণত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি এবং শান্তি স্থাপনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীরব কাজকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রধান, পূর্বতন নোবেল বিজয়ী এবং নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সদস্যরা নিয়ম অনুযায়ী এই মনোনয়ন দিতে পারেন।
পিল্লাইকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন : নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ে নাভি পিল্লাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, পিল্লাই অবিচারের নৃশংসতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন অদম্য সাহসে, কখনো পিছু হটেননি। তিনি লেখেন, ন্যায়বিচার, শান্তি আর মানবমর্যাদার লড়াইয়ে নাভি পিল্লাইয়ের মতো নিজের জীবন সঁপে দেওয়ার নজির মেলা ভার। তিনি নিপীড়িত, অসহায়, বঞ্চিত ও কণ্ঠহীন মানুষের পক্ষে সবসময় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ফন ডার লিয়েন বলেন, আজকের এই অন্যায়ে ভরা বিশ্বে, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেখানে তার সাহস আর স্পষ্ট নীতিবোধ আমাদের সঠিক পথ দেখানোর এক অমূল্য দিশারি।









