এই সমাজ শিশুর জন্য নয়, বয়োবৃদ্ধ মানুষের জন্য নয়! নারীর জন্যও নয়! কেমন এক রবোটিক, ভয়ানক আত্মকেন্দ্রিক সমাজে আমাদের বসবাস! প্রতিদিন কোন না কোন হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি। রত্নগর্ভা(?) নূুর জাহান বেগমের এই রত্নগুলো নিরেট পাথুরে রত্ন! নয়তো বন্ধ দরজার ওপারে কেমন করে পড়ে থাকে এতো এতো আবর্জনার স্তূপের ভিতর একজন মায়ের পচাগলা লাশ! সেদিনমাত্র ঈদ গেল। একজন সন্তানেরও কি মনে হলো না মায়ের একটু খবর নেওয়া দরকার? এমন কি পাশের ঘরে থাকা মেয়েটির মনেও আসলো না মায়ের কথা! এটা কি শুধু একটা পারিবারিক ট্র্যজেডি? শুধুই একটি স্বার্থপর পরিবারের গল্প? একেবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা? কত দিবসের বহরে আমরা রাঙ্গিয়ে তুলি মা দিবস, বাবা দিবস, কন্যা দিবস, নারী দিবস। পত্রপত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া কত ঝলমলে ফিচার তৈরি করে। আবেগের তোড়ে ভেসে যায় সোশ্যাল মিডিয়া! ফাঁপানো–ফুলানো দিবসের তলানিতে পড়ে থাকে আমাদের সত্যিকারের মানবিক বোধগুলো! আমরা যা নই তাই আমরা দেখিয়ে বেড়াই! এই জগৎ সংসার পুরোটাই একটা কর্পোরেট কোম্পানি। আমরা কেবল মার্কেটিং–এ ব্যস্ত! একজন নূর জাহান বেগমের ছোট ছেলে মা দিবসের আবেগঘন পোস্ট শেয়ার করেছে! এর চেয়ে বড় কৌতুক আর কি হতে পারে? এখন কমবেশি সবার দুটো চেহারা! সোশ্যাল মিডিয়ার আদর্শ সুন্দর চরিত্রটিতে হয়তো লুকিয়ে আছে গভীর কোনো অন্ধকার! ষাটের দশকে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমাদের জেনারেশনকে সম্ভবত বলা হয় বুমার্স! আমাদের মা–বাবাদের ডজনখানেক সন্তান থাকতো। পরিবারে মা–বাবা সন্তান ছাড়াও থাকতো দাদা–দাদী ফুফু চাচারাও। এসব একান্নবর্তী পরিবারগুলোর মধ্যে বন্ধনটা সুদৃঢ় ছিল। সহানুভূতি ছিল। বয়োজ্যেষ্ঠ কিংবা শিশুদের দেখাশুনা সবাই মিলেই করতো। সমস্যা একেবারে ছিলনা তা নয়। কিন্তু সেটা পরিবারের মধ্যে আবদ্ধ থাকতো। বয়োজ্যেষ্ঠরা দাপটের সাথে থাকতেন। সেসব দিনরাত্রির গল্প এখন চলে না। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। মানুষ এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। এখন মানুষ নিজের জন্য বাঁচে। ঝবষভ ঈবহঃবৎবফ! এটাই বাস্তবতা! এটাই সত্য। বৃদ্ধাশ্রম এই সমাজের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আমরা এক নূরজাহান বেগমের কথা জানি আরও অসংখ্য নূরজাহান বেগম ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কত বৃদ্ধ বাবা মা অবহেলিত অসম্মান নিয়ে পড়ে আছে নিজ সন্তানের পরিবারে। ২০১৩ সালে মা–বাবার ভরনপোষণের জন্য শেখ হাসিনার সরকার একটা আইন করেছিল সেই আইনে কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। কত শত আইন! নারীর জন্য আইন, শিশুর জন্য আইন! মানছে কেউ? প্রয়োগ হয়? বন্ধ ঘরের ওপারে আইনের নিকুচি হয়! নচিকেতার গানে আমরা আবেগতাড়িত হই। কিন্তু আমাদের বর্তমান সময়ের বাস্তবতাকেও তো মানিয়ে চলতে হবে! সব সন্তান হয়তো নূরজাহান বেগমের সন্তানদের মতো নয়। কিন্তু তারা চাইলে নানা কারণে থাকতে পারে না। পরিচিত অপরিচিত অনেক পরিবার মা কিংবা বাবাকে নিয়ে একটা অস্বস্তিকর জীবন কাটাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে এটার পক্ষে জোরালো সামাজিক অবস্থান তৈরি হওয়া প্রয়োজন। বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা এবং সঙ্গ প্রদানের একটা ব্যবস্থা তৈরি হোক। সন্তানহীন ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় একাকীত্ব ও সুরক্ষার অভাবে প্রবীণদের বৃদ্ধাশ্রম এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা, প্রবাসীরা, ব্যবসায়ীরা প্রায় দেখা যায় প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এতিমখানা ও মসজিদ বানান বেহেশতের প্রত্যাশা নিয়ে। এতো এতো মসজিদ ও এতিমখানার পাশাপাশি দু–চারটা বৃদ্ধাশ্রম তো করাই যায় এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য। যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষগুলোর মৃত্যুর সময় দু’ফোটা পানি দেওয়ার জন্য কেউ অন্তত পাশে থাকুক। আদর্শ সুন্দর বাসযোগ্য বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠুক প্রতিটি শহরে, নগরে এমনকি প্রতিটি গ্রামেও।
বিদেশে বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে বৃদ্ধরা ভালো থাকে। সরকারই তাদের দায়িত্ব নেয়। তাদের সোশ্যাল সিকিউরিটির ব্যবস্থা থাকে। থাকে কেয়ার গিভার। থাকে স্বাস্থ্যসেবা। কাউকে কোন ঝামেলায় পড়তে হয় না। কাউকে অবহেলা অসম্মান নিয়ে মরতেও হয়না। নূরজাহান বেগমের মতো এমন নির্দয় মর্মান্তিক মৃত্যু যেন কোন মা–বাবার নাহয়। মা–বাবার ভরণপোষণের আইনটি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হোক সরকারি বেসরকারি ও এনজিওর মাধ্যমে। মানুষ জানুক এমন একটা আইন আছে। এবং মা–বাবার ভরণপোষণের অবহেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।












