নিজের মতো বেঁচে থাকার গল্প বলে “হদিস”

তিলোত্তমা মিলি | শুক্রবার , ২৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ

একজন নিঃসঙ্গ মধ্যবয়সী অধ্যাপিকা একটি নামহীন শহরের ফুটপাত, ওয়েটিং রুম, বুকস্টোর, কফিশপ, সেলুন, সুপারমার্কেটসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। দৈনন্দিন জীবনের নানা সময়ে চেনাঅচেনা মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, নানা অভিজ্ঞতা হয়। সেসব অভিজ্ঞতা তিনি ডায়েরির মতো করে ৪৬টি অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করেন।

এই অভিজ্ঞতার ফাঁকে ফাঁকে অধ্যাপিকা ফিরে যান তাঁর শৈশবের স্মৃতিতে। জানতে পারি, একটি ডিসফাংশনাল পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠার কথা। ডিসফাংশনাল পরিবারে বেড়ে ওঠা মানেই সন্তান উগ্র, অবাধ্য বা অসফল হবে এমন একটা প্রচলিত ধারণা আছে। কিন্তু এর বিপরীতটাও হতে পারে। কেউ কেউ বরং নিঃসঙ্গ, বিহ্বল, হতভম্ব এবং অতিচিন্তায় নিমগ্ন হয়ে উঠতে পারে, এমনকি বিষণ্নতা বা বন্ধনহীন জীবনকেও বেছে নিতে পারে।

তবে অধ্যাপিকা তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের মধ্যেও ইতিবাচক কিছু দিক খুঁজে পান। তাঁর মা অবশ্য নিঃসঙ্গতাকে সেভাবে দেখতে চান না। মায়ের কাছে নিঃসঙ্গতা একটি ঘাটতি, অথচ অধ্যাপিকার কাছে এটি নিজের মতো করে থাকার একটি সুযোগ।

বহু বছর ধরে আমরা দুজনেই একা এবং আমি জানি যে ভেতরে ভেতরে মা আমাদের নিঃসঙ্গতা নিভিয়ে সেই মিশ্রণকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। মায়ের ধারণা এতে আমাদের দুজনেরই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু আমার অস্বীকৃতি, মায়ের সাথে একই শহরে বাস করতে আমার অনীহা, তার দুর্ভোগকে আরও প্রলম্বিত করেছে। আমি জানি যদি মাকে বলি এই নিঃসঙ্গতার পরেও আমি কৃতজ্ঞ আমার মতো করে থাকার জন্য, এমনকি বাইরে যাওয়ার সময়ও যে আমাকে কখনো বাতি নেভাতে বা রেডিও বন্ধ করতে হয় না সেজন্যমা সেটা বুঝবে না। সে শুধু বলবে নিঃসঙ্গতা একটা ঘাটতি। নিঃসঙ্গতার মাঝে যে ছোট ছোট আনন্দ পাওয়া যায়, সেটা বোঝার সাধ্য তার নেই। তার সাথে এসব নিয়ে আলাপের কোনো মানেও তাই হয় না। আমাকে সে এত বছর আঁকড়ে রেখেছিল, তবুও আমার দৃষ্টিভঙ্গি জানা নিয়ে তার কোনো উৎসাহ নেইআমাদের দুজনের মাঝে এই দূরত্বই আমাকে শিখিয়েছে নিঃসঙ্গতা মানে আসলে কী।”

অধ্যাপিকার স্মৃতিচারণের সঙ্গে সঙ্গে পিতার মৃত্যুকে ঘিরে থাকা গ্লানি ও ক্ষোভও উঠে আসে।

আমি আর মা যখন তর্ক করতাম, তুমি খুব সংক্ষেপে সোজাসুজি বলতে: আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো? আমার এতে কিছুই করার নেই। শুধু এই বাক্য দুটি পুনরাবৃত্তি করতে। তোমার এই উত্তর আমার কাছে নির্মম ও কাপুরুষোচিত মনে হতো। কিন্তু এর ফলস্বরূপ, আমি শিখে গেলাম যাতে তোমাকে কখনোই কিছুতে না জড়াই, কখনো আশা করিনি তুমি রক্ষা করবে।এ কারণে, আজ তোমার হিমশীতল সমাধিতে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারি না। আমাদের বিতর্কে কখনোই অংশগ্রহণ না করে আমাকে না রক্ষা করার জন্য আমি তোমাকে ক্ষমা করব না। আমার রক্ষক হওয়ার ভূমিকা তুমি ছেড়ে দিয়েছিলে নিজেকে সেই ঝঞ্ঝাটপূর্ণ বাড়ির শিকার মনে করে।”

উপন্যাসটি মূলত নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার এক সুন্দর প্রতিচ্ছবি। এখানে নিঃসঙ্গতা শুধু একাকী থাকার অভিজ্ঞতা নয় বরং নিজের সঙ্গে, নিজের অতীতের সঙ্গে এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে বোঝার একটি ভিন্ন যাত্রা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে চট্টগ্রামে লেগো প্রকল্পের যাত্রা : শামীম
পরবর্তী নিবন্ধশ্রাবণের ধারায়