চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ভারী ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পর্যটন, জাহাজ নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত সরকারগুলো চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী, শিল্পনগরী ও বন্দরনগরী হিসেবে অভিহিত করলেও বাস্তবে এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও শিল্পায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থেকেছে অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও শিল্পায়নের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও লেখালেখি হলেও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব, চট্টগ্রাম চেম্বার এবং বিভিন্ন অংশীজনের কাছ থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি।
সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের চট্টগ্রাম সফর নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ২৭ অক্টোবর প্রতিনিধি দল মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। পরদিন চট্টগ্রাম ও কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, প্রস্তাবিত আনোয়ারা চায়না ইকোনমিক জোন এবং কোরিয়ান ইপিজেড পরিদর্শন করেন। এ সময় শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত অবস্থা, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং শিল্পায়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো সম্পর্কে সরেজমিনে অবহিত হন।
মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পকারখানা স্থাপন, সড়ক যোগাযোগ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ এবং বন্দরসুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
পরিদর্শনকালে বিনিয়োগকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে বন্ড ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপ, নির্দিষ্ট ধরনের সুতার ওপর আমদানি শুল্ক এবং প্রস্তাবিত ইপিজেড কাস্টমস বিধিবিধান দ্রুত চূড়ান্ত করা। বিষয়গুলো আপাতদৃষ্টিতে কারিগরি ও রাজস্বসংক্রান্ত মনে হলেও শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা, রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু জমি বরাদ্দ কিংবা কারখানা স্থাপনের অনুমতি যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, পর্যাপ্ত পানি, কাস্টমস সুবিধা, সহজ শুল্কায়ননীতি, দ্রুত পণ্য খালাস এবং কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের প্রকৃত মানদণ্ড হলো একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কতটা সহজে, সাশ্রয়ী ব্যয়ে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন এবং রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন কেবল ইপিজেড, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, চায়না ইকোনমিক জোন, কোরিয়ান ইপিজেড কিংবা প্রস্তাবিত জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নগরীর সড়ক যোগাযোগ, যানজট, পরিবহনব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চলের সংযোগ সড়ক এবং নগর অবকাঠামো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বন্দরের সক্ষমতা বাড়লেও পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। তাই যানজট নিরসন, বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনে কার্যকর সড়ক ও রেল সংযোগ, কর্ণফুলী নদীর পরিবেশ রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিকল্পিত নগরায়ণকে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের এ সফরের তাৎপর্য হলো, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরেজমিনে শিল্পায়নের বাস্তব অবস্থা ও বিনিয়োগকারীদের সমস্যাগুলো দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এখন প্রয়োজন চিহ্নিত সমস্যাগুলোকে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া। কোন সমস্যা কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা সমাধান করবে, কত দিনের মধ্যে করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত থাকা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, এ সফর যেন কেবল আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন বা সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সংকটগুলো জাতীয় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব পায়।
চট্টগ্রামের শিল্পায়নে কোরিয়ান ইপিজেড ও আনোয়ারা চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কোরিয়ান ইপিজেড এ অঞ্চলের শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সেখানে ইতিমধ্যে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও গ্যাস সংযোগের অভাবে সেগুলো পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। এতে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হচ্ছে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বিদ্যমান বিনিয়োগের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, এক দশকের অপেক্ষা এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে বাস্তব নির্মাণের পথে যাত্রা শুরু করেছে আনোয়ারার বহুল প্রত্যাশিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে ওঠা এ শিল্পাঞ্চলে ৩০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের সরকার–টু–সরকার (জি–টু–জি) সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারার বেলচুড়া এলাকায় অবস্থিত। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় শিল্প ও লজিস্টিকস খাতে এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এ জোনের শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদনে যেতে পারে।
প্রকল্পটি ২০১৪ সালে গৃহীত হয়। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ও বিষয়টি আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিনের নানা বাধা ও জটিলতা অতিক্রম করে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হওয়া চট্টগ্রামের শিল্পায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর পাশাপাশি কোরিয়ান শিল্পাঞ্চলের অবস্থান এ অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে আরও সমপ্রসারিত করেছে। এ দুটি শিল্পাঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
এদিকে, সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। স্বাক্ষরিত দলিলগুলোতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। চীন, ভারত ও জাপানের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ বিবেচনায় রেখে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ ও দ্রুত অনুমোদনপ্রক্রিয়া, চুক্তির নিশ্চয়তা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি উত্তরণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কার সাধনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ধিত সময়কে কাজে লাগিয়ে রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের সামনে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেড, আনোয়ারা চায়না ইকোনমিক জোন এবং জাপানের সম্ভাব্য বিনিয়োগ এ সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। তবে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তব উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপ না নিলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। তাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্প উদ্যোক্তাদের সমস্যার সমাধান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক– শিল্পশৈলী।












