কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাসাহ্যিত্যের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। সাহিত্যের সব শাখায় তিনি সদর্পে বিচরণ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। কবিতা রচনায় তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতা’র সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল। নজরুল সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সামপ্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি–বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ব্যতিক্রম, দেশি শব্দের পাশাপাশি বিদেশি শব্দের ব্যবহার রচনাশৈলিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। নানা বৈচিত্র্যে ভরা তাঁর জীবন। লেটোর দল, রুটির দোকানের কর্মচারী, সৈনিক জীবন, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা – কোনো কিছুই বাদ যায়নি।
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর আগমন ও তাঁর শানে প্রচুর নাতে রাসূল, গান লিখেছেন। ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে/যেন ঊষার কোলে রাঙা–রবি দোলে/কূল মখ্লুকে আজি ধ্বনি ওঠে, কে এলো ঐ/কলেমা শাহাদতে বাণী ঠোঁটে, কে এলো ঐ/খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে, কে এলো ঐ/আকাশ–গ্রহ–তারা পড়ে লুটে, কে এলো ঐ/পড়ে দরুদ ফেরেশ্তা, বেহেশ্তে সব দুয়ার খোলে/মানুষে মানুষের অধিকার দিল যে–জন/এক আল্লাহ্ ছাড়া প্রভু নাই কহিল যে–জন/মানুষের লাগি’ চির–দীন্ বেশ ধরিল যে–জন/বাদশা ফকিরে এক শামিল করিল যে–জন/এলো ধরায় ধরা দিতে সেই সে নবী/ব্যথিত–মানবের ধ্যানের ছবি/আজি মাতিল বিশ্ব–নিখিল্ মুক্তি–কলোরোলে।’
এই গানে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জন্মকে কেন্দ্র করে মানবমুক্তি, সাম্য, ন্যায় ও করুণার এক মহামুহূর্তের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবি মহানবী (দ.) এর জন্মকে কেবল একটি শিশুর জন্ম হিসেবে দেখেননি, বরং মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর আবির্ভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও মুক্তির আলোকধারা প্রবাহিত হয়েছে–এই উপলব্ধিই গানের মূল প্রতিপাদ্য। অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাসকে অপসারিত করে–শিশু নবী আবির্ভুত হয়েছিলেন পূর্ণিমা বা উষাকালের সূর্যের মতো। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ‘জুলফিকার’ নামক গীতি–গ্রন্থে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।
নজরুল–মানসে আল্লাহ ও রাসূল (দ.) বিভিন্ন মাত্রিকতায় ধরা দিয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর রূপ, গুণ, কর্মজীবন, শিষ্টাচার নজরুলের শেষ আশ্রয়স্থল এবং তাঁর আদর্শের বাস্তবায়নসহ বহুবিধ বিষয়কে উপজীব্য করে তিনি নাতে রাসুল রচনা করেছেন। ‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে/তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান, (ওরে) এমন মধুর লাগে/ওরে গোলাপ নিরিবিলি/নবীর কদম ছুঁয়েছিলি/তাঁর কদমের খোশবু আজো তোর আতরে জাগে।’ এমন অসংখ্য নাতে রাসূলে (দ.) ওঠে এসেছে প্রিয় নবীর প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা। রাসূলকে (দ.) নিয়ে নজরুল এত গান রচনা করেছেন ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। এ অসাধ্য সাধন করেছেন নজরুল। তাঁর রচিত ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ/এলো রে দুনিয়ায়/আয়রে সাগর আকাশ বাতাস/দেখবি যদি আয়।’ এ গান তো বাঙালি মুসলমানের মুখে মুখে। মুসলমান যখনই সুরে সুরে প্রিয় নবীকে স্মরণ করতে চান তখনই তার অজান্তে হলেও মনের মধ্যে ভেসে ওঠে চির নতুন এ সুর। যেন আজও বাতাসে দোল খাচ্ছে প্রিয় নবীর দোলনা। আজও কানে বাজে আর জীবন্ত হয়ে ওঠে সে দৃশ্য।
নজরুলের চেতনায় সাহারা মরুভূমিতে গুলিস্তানের আবাদ হয়েছে নবীজির আবির্ভাবে। সাহারার ধূলিপথের ওপর দিয়ে যখন সে মহাপুরুষের পদচারণা হত সে খবর বুলবুলি তার সুরে সুরে পৌঁছে দিত ‘সাহারাতে ফুটল রে রঙিন গুলে লালা’। যে ফুলের সুগন্ধে সূর্য, আকাশ, বাতাস, সাগর, নদী, তারকাসহ সমগ্র প্রকৃতি আচ্ছন্ন, নজরুলের মায়াবী বর্ণনায় রাসূল (দ.)-এর আবির্ভাব ও তার পবিত্র উপস্থিতি প্রকৃতির রূপকল্পে উঠে এসেছে। যা নিঃসন্দেহে বিচিত্র, বর্ণিল, প্রাণময় আন্তরিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ‘সাহারাতে ফুটল রে রঙিন গুলে লালা/সেই ফুলেরি খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা। সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ সুরুজ গ্রহ–তারায়/ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগন নিরালা। সেই ফুলেরি রঙ লেগে আজ ত্রিভুবন উজালা। চাহে সে ফুল জ্বীন ও ইনসান হুরপরী ফেরেশতায়/ফকির দরবেশবাদশা চাহে করিতে গরার মালা (তারে)/চেনে রসিক ভ্রমর, বুলবুল সেই ফুলের ঠিকানা/কেউ বলে হযরত মোহাম্মদ (বলে) কেউ বা কমলিওয়ালা।’
মানুষ না হয়ে যদি মদিনার মাটি হতাম তাহলেও সে আক্ষেপ ঘুচে যেত প্রিয় নবীর ধুলি নিয়ে। নজরুল লিখছেন, ‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ/এই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবী হযরত/পয়জার তাঁর লাগত এসে আমার কঠিন বুকে, আমি ঝর্ণা হয়ে গলে যেতাম অম্নি পরম সুখে/সেই চিহ্ন বুকে পুরে পালিযে যেতাম কোহ্–ই–তুরে/দিবা নিশি করতাম তাঁর কদম জিয়ারত। মা ফাতেমা খেলতো এসে আমার ধূলি ল’য়ে/আমি পড়তাম তাঁর পায়ে লুটিয়ে ফুলের রেণু হয়ে। হাসান হোসেন হেসে হেসে/ নাচতো আমার বক্ষে এসে/ চক্ষে আমার বইতো নদী পেয়ে সে নেয়ামত।’
দরুদ পাঠ মুসলিম সমাজের একটি নিদর্শন, রাসুল (দ.)- এর প্রতি ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন, গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী আমল। হৃদয় নিংড়ানো সুরে রাসূলে পাক (দ.) এর প্রতি ভালোবাসায় বিমোহিত হন সকলে। নজরুল হৃদয়কাড়া দরুদ পড়ে ভালোবাসায় পতিত হন রাসুল (দ.) এর প্রতি। তিনি লিখেন-‘কুল মখলুক গাহে হযরত/বালাগাল উলা বেকামালিহী/আঁধার ধরায় এলে আফতাব/কাশাফাদ দুজা বেজমালিহী/রৌশনীতে আজো ধরা মশগুল/তাইতো ওফাতে করি না কবুল/হাসনাতে আজো উজালা জাহান/হাসুনাত জমিউ খেসালিহী/নাস্তিরে করি’ নিতি নাজেহাল/জাগে তাওহীদ দ্বীন–ই কামাল/খুশবুতে খুশী দুনিয়া বেহেশত/সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহী।’
হযরত মুহাম্মদ (দ.) সমগ্র সৃষ্টিকূলের নবী। যেভাবে পবিত্র কোরআন শরিফে বর্ণিত হয়েছে রাসুল (দ.) সমগ্র সৃষ্টির জন্যই এসেছেন রহমত হয়ে। ‘হে মদিনার বুলবুলি গো/গাইলে তুমি কোন গজল/মরুর বুকে উঠল ফুটে/প্রেমের রঙিন গোলাপ দল/দুনিয়ার দেশ–বিদেশ থেকে/গানের পাখি উঠল ডেকে/মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনি/উঠল ভেদি গগনতল/সাহারার দগ্ধ বুকে রচলে তুমি গুলিস্তান সেথা/আসহাব সব ভ্রমর হয়ে শাহদতের গাইল গান।’
হযরত মুহাম্মদ (দ.) কে নিয়ে গান–হামদ–নাত নজরুলের হাতে সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠেছে সার্থক ও অনবদ্য। চৌত্রিশ বছর কবি নির্বাক না থাকলে আরো অনেককিছু সৃষ্টি করতে পারতেন। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে দাফন করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।








