দৈনিক আজাদীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আঞ্চলিক শিকড়

এস এম ওমর ফারুক | বৃহস্পতিবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে যে কটি প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে, দৈনিক আজাদী তাদের অন্যতম। ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকাটি দীর্ঘ ৬৬ বছরের পথ অতিক্রম করে ৬৭ বছরে পদার্পণ করেছে, এটি আজও পাঠকের আস্থা ও ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে চলছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি শুধু সংবাদ পরিবেশন করেনি; বরং চট্টগ্রামের মানুষের আশাআকাঙ্ক্ষা, আন্দোলনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও নাগরিক জীবনের এক নির্ভরযোগ্য দলিল হয়ে উঠেছে।

দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও প্রকৌশলী আবদুল খালেক। তাঁর দূরদর্শী উদ্যোগে চট্টগ্রাম থেকে একটি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

আজাদীর জন্মের পেছনে ছিল চট্টগ্রামের মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার আকাঙ্ক্ষা। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদ পরিবেশনের বাইরে গিয়ে চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের জীবন, সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রত্যাশাকে সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরাই ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আজাদী চট্টগ্রামের মানুষের ঘরের পত্রিকায় পরিণত হয়।

পাকিস্তান আমলে বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে যখন আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছিল, তখন সংবাদপত্রগুলো জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আজাদীও সেই ধারার বাইরে ছিল না। বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি ও স্বাধিকারচেতনার বিকাশে পত্রিকাটির ভূমিকা চট্টগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

দৈনিক আজাদীর ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের মধ্যেও সংবাদপত্র ছিল মানুষের সাহস ও প্রতিরোধের অন্যতম মাধ্যম। সেই ভয়াবহ সময়ে সংবাদ প্রকাশ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। চট্টগ্রাম ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাবলির সঙ্গে আজাদীর ইতিহাসও গভীরভাবে যুক্ত।

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদীর প্রকাশিত সংখ্যা বিশেষ ঐতিহাসিক মর্যাদা অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র হিসেবে ওই সংখ্যাটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি অনন্য স্মারক হয়ে আছে। স্বাধীনতার আনন্দ, নতুন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা এবং একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয়ের আবেগ সেই সময়ের সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিফলিত হয়েছিল।

চট্টগ্রামের মুখপত্র : দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দৈনিক আজাদীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আঞ্চলিক শিকড়। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পত্রিকাটি যে সাংবাদিকতার ধারা তৈরি করেছে, তা বাংলাদেশের আঞ্চলিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, ব্যবসাবাণিজ্য এবং প্রবাসী অর্থনীতির সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। চট্টগ্রামের এই বহুমাত্রিক জীবনকে সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে আজাদীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, যানজট, পাহাড় কাটা, পরিবেশ বিপর্যয়, বন্দর সমস্যা, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা কিংবা নাগরিক সেবা স্থানীয় সমস্যাগুলো নিয়ে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আজাদী জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের সাফল্য, কৃতিত্ব ও সম্ভাবনাকেও দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।

দৈনিক আজাদীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতা বহু লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মীর জন্য লেখালেখির ক্ষেত্র তৈরি করেছে। একটি অঞ্চলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশে স্থানীয় সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রামের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও লোকজ জীবন নিয়ে নানা লেখা প্রকাশের মাধ্যমে আজাদী আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করেছে। সংবাদপত্রের পাতায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য জায়গা করে দেওয়া শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেরও অংশ।

নতুন যাত্রা : ২০২৬ সালে দৈনিক আজাদী ৬৭ বছরে পদার্পণ করেছে। ছয় দশকের বেশি সময় কোনো সংবাদপত্রের টিকে থাকা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সাংবাদিক, সম্পাদক, লেখক, সংবাদকর্মী, মুদ্রণকর্মী, হকার, পরিবেশক এবং সর্বোপরি অগণিত পাঠকের অবদান।

আজাদীর ইতিহাস আসলে চট্টগ্রামেরও ইতিহাসের একটি অংশ। এই পত্রিকার পুরোনো সংখ্যাগুলো খুললে একদিকে যেমন রাজনৈতিক ইতিহাস পাওয়া যায়, অন্যদিকে পাওয়া যায় নগরের পরিবর্তনের ইতিহাস, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির নানা দলিল।

পরিশেষে বলা যায়, ৬৭ বছর একটি দীর্ঘ সময়। একটি মানুষের জীবনের প্রায় পুরোটা সময়। এই দীর্ঘ সময়ে প্রজন্ম বদলেছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদপত্রের ভাষা ও উপস্থাপনার ধরন বদলেছে। কিন্তু মানুষের সত্য জানার প্রয়োজন বদলায়নি।

দৈনিক আজাদীর সামনে তাই নতুন দিনের চ্যালেঞ্জও অনেক। মুদ্রিত পত্রিকার ঐতিহ্য, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে অটুট রেখে ডিজিটাল যুগের নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছানোই হবে আগামী দিনের বড় দায়িত্ব। একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত শক্তি তার মুদ্রণযন্ত্রে নয় তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। সেই বিশ্বাসই পাঠক ও সংবাদপত্রের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করে। দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই শুভেচ্ছা তার ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হোক, সাংবাদিকতা আরও সত্যনিষ্ঠ হোক, আর চট্টগ্রামের মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে এর পথচলা আরও দীর্ঘ হোক।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কায়সার নীলুফার সিটি করর্পোরেশন কলেজ; শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবহতা এক নদীর নাম টংকাবতী
পরবর্তী নিবন্ধগ্যাস সংকট: শুধু আপাতত ব্যবস্থাপনা নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী আত্মনির্ভর জ্বালানি কৌশল